বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার অনেক পর্যটন এলাকায় হাতির পিঠে চড়াকে মজার একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো হয়। বড় আকারের প্রাণী দেখে অনেকেই মনে করেন—হাতি সহজেই মানুষের ওজন বহন করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে—এই ধারণা ভুল।
হাতির মেরুদণ্ড বা স্পাইন এমনভাবে তৈরি যে সেটি শুধু তার নিজের বিশাল দেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর কাঠামো বহনের জন্যই উপযোগী। ঘোড়া বা উটের মেরুদণ্ডে যেখানে মানুষ বসতে পারে, সেখানে চাপ ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু হাতির মেরুদণ্ডের কাঁটা উঁচু ও ধারালো, ফলে স্যাডেল, দড়ি ও মানুষের ভার সরাসরি সেই কাঁটাগুলোর ওপর পড়ে।
ক্ষত, ব্যথা, বিকৃতি—হাতির প্রতিদিনের সংগ্রাম
হাতির পিঠে পর্যটক বসালে দেখা যায়—
- ত্বকে ঘষা লেগে ক্ষত
- টিস্যু ও মাংসপেশিতে আঘাত
- দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা (chronic pain)
- মেরুদণ্ডের আকার বদলে যাওয়া
World Animal Protection, Humane Society ও ElephantVoices–এর গবেষণায় শত শত হাতির MRI ও চিকিৎসা রিপোর্টে দেখা গেছে—
অনেক হাতির ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যায়।
চলাফেরা, খাওয়া, এমনকি দলবদ্ধ আচরণেও পরিবর্তন আসে।
বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামের পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা হাতিদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র—
অনেক হাতি এখনো দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, পেশির ক্ষতি এবং দুর্বলতায় ভুগছে।
কাঠের ভারী স্যাডেল—হাতির জন্য নির্মম যন্ত্রণা
পর্যটন এলাকাগুলোতে ব্যবহৃত কাঠের rigid saddle (কঠিন স্যাডেল) হাতির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ।
অনেক সময় একসঙ্গে ১০–১২ জন মানুষও বসানো হয়। কাঠের চাপ, দড়ির টান আর ঘষায় হাতির পিঠে গভীর ক্ষত ও রক্তক্ষরণ হয়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়—
“হাতি শক্তিশালী হলেও, তাকে কখনো মানুষের বাহন বানানোর জন্য প্রকৃতি তৈরি করেনি।”
শরীরের পাশাপাশি মানসিক ক্ষতিও হয়। অতিরিক্ত কাজ, শব্দ, ভিড়, চাপ—হাতিকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। Stress hormone বেড়ে যায়, আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
বিশ্বজুড়ে ‘এলিফ্যান্ট রাইড’ বন্ধের আহ্বান
বিভিন্ন প্রাণীকল্যাণ সংস্থা বলছে—
“এটি সোজা কথায় নিষ্ঠুরতা। হাতি কোনো খেলার সামগ্রী নয়।”
তাদের পরামর্শ—
- নৈতিক ভ্রমণ (ethical tourism)
- বনে বা সংরক্ষিত এলাকায় দূর থেকে হাতি দেখা
- ছবি তোলা
- হাতির স্বাভাবিক আচরণ পর্যবেক্ষণ
- দায়িত্বশীল sanctuary ভ্রমণ
- বিশ্বব্যাপী বার্তা স্পষ্ট—
হাতির পিঠে চড়া বন্ধ করুন।
প্রকৃতিকে ও প্রাণীকে সম্মান করুন।
মানবিক সিদ্ধান্ত—মুক্ত থাকুক হাতির জীবন
পর্যটকদের দুই মিনিটের আনন্দের জন্য হাতির সারাজীবনের ক্ষতি মেনে নেওয়া যায় না।
সচেতনতা বাড়ছে—মানুষ বুঝছে, বিনোদনের নামে প্রাণীর কষ্ট দেওয়া নৈতিক নয়।
সবশেষে আহ্বান—
“হাতির পিঠে চড়া বন্ধ করুন।
বনের প্রাণীকে বনে থাকতে দিন।
প্রকৃতিকে তার স্বস্তি ফিরিয়ে দিন।”