একটি স্বপ্ন থেমে গেল। একটি কণ্ঠ চিরতরে নীরব হয়ে গেল। জুলাই বিপ্লবের অগ্রনায়ক, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক শরীফ ওসমান হাদি আর নেই। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৩০ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মাত্র ৩২ বছর বয়সেই থেমে গেল এক অদম্য যাত্রা।
তার মৃত্যুর খবরে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় দেশ। শহর থেকে গ্রাম, রাজপথ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই নেমে আসে শোকের নীরবতা। যারা তাকে কাছ থেকে চিনতেন, তারা বলছেন—হাদি ছিলেন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি ছিলেন সময়ের উচ্চারণ, তরুণদের আশার ভাষা।
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি। প্রচার শেষে ফেরার পথে পল্টনের কালভার্ট রোডে আচমকা ঘাতকের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা—বাঁচবে তো? চিকিৎসকদের চোখেমুখে ছিল শঙ্কা। পরিবারের চোখে ছিল অনিশ্চিত অপেক্ষা। অবশেষে গত সোমবার সরকার জরুরি ভিত্তিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। কিন্তু সেখানেও তাকে ঘিরে ধরে মৃত্যুর ছায়া।
বৃহস্পতিবার পরিবারের সম্মতিতে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে তার মস্তিষ্কে আটকে থাকা গুলি অপসারণের অস্ত্রোপচার করেন। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের বুকের ভেতর তখন জমে ছিল পাহাড়সম ভয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে হাদি হার মানেন না জীবন নয়—মৃত্যুর কাছেই।
এর আগের রাতেই সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, ‘হাদির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।’ সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়।
হাদির মৃত্যুর পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি জাতির ক্ষতি। তিনি হাদির স্ত্রী ও সন্তানের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে বলে ঘোষণা দেন এবং একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত করেছে, এই হত্যাচেষ্টার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ হামলার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। পরিকল্পিত এই পলায়ন দেশজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—কে রক্ষা করছে ঘাতকদের?
ইনকিলাব মঞ্চ এক আবেগঘন বিবৃতিতে জানায়, হাদি শহীদের কাতারে শামিল হয়েছেন। তার হত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বে না স্বাধীনতাকামী জনতা। শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শীর্ষ নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এই অকাল মৃত্যু আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—রাজনৈতিক সহিংসতা কত বড় মানবিক ট্র্যাজেডি তৈরি করে।
যে মানুষটি বলতেন, “দেশ কোনো আপসের জায়গা নয়”—আজ সেই মানুষটিই হয়ে গেলেন ইতিহাসের অংশ। শরীফ ওসমান হাদি নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয়ে রইল।