বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮০ বছর।
বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন বেগম জিয়া এবং শেষ কয়েক সপ্তাহে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
শেষ সময়ের উপস্থিতি ও হাসপাতালের পরিবেশ
মৃত্যুর সময় এভারকেয়ার হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমান, নাতনী জাইমা রহমান, ছোট ছেলের স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি, ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারসহ আত্মীয়স্বজনেরা। পাশাপাশি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মেডিক্যাল বোর্ডের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরাও সেখানে অবস্থান করছিলেন।
দলীয় সূত্র জানায়, জানাজা ও দাফনের সময়সূচিসহ আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি পরে জানানো হবে। ইতোমধ্যে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় অফিসে কালো পতাকা উত্তোলন ও শোক কর্মসূচির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
জন্ম, পরিবার ও শৈশব
বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। জীবনীসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর জন্মস্থান ছিল অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার নয়াবস্তি এলাকা। পারিবারিকভাবে তাঁর নাম ছিল খালেদা খানম। শৈশবে তিনি ‘পুতুল’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন; পরিবারে টিপসি ও শান্তি নামেও তাঁকে ডাকা হতো।
তাঁর পিতা ইস্কান্দর মজুমদার এবং মাতা বেগম তৈয়বা মজুমদারের আদি নিবাস ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বর্তমানে তাঁর এক বোন সেলিনা ইসলাম এবং ভাই শামীম ইস্কান্দার জীবিত আছেন।
রাজনীতিতে পদার্পণ ও নেতৃত্বের সূচনা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেগম খালেদা জিয়ার প্রত্যক্ষ সক্রিয়তা শুরু হয় স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৮৩ সালের মার্চে তাঁকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। একই বছরের ১ এপ্রিল দলের এক বর্ধিত সভায় তিনি প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে দলীয় সিদ্ধান্তে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে বেগম খালেদা জিয়া দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর টানা প্রায় চার দশক তিনি দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থেকে বিএনপিকে পরিচালনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিন দফা শাসনকাল
বেগম খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি পঞ্চম জাতীয় সংসদের প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর শাসনামলেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে দেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি স্বল্প সময়ের জন্য ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হলে পুনর্নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয় এবং তিনি বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা গ্রহণ করেন।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষমতায় ফিরে এসে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আবারও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলে তিনি সে নির্বাচনে অংশ নেননি।
কারাবাস, মামলার রায় ও মুক্তির প্রক্রিয়া
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং পুরোনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার বিশেষভাবে প্রস্তুত করে সেখানে রাখা হয়। পরে গুরুতর অসুস্থতার কারণে তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ওই সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন। ২০২০ সালের মার্চ মাসে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়ে তিনি গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় অবস্থান শুরু করেন। তবে তাঁর বিদেশ যাত্রা ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
দীর্ঘ অসুস্থতা ও শেষ চিকিৎসা
দীর্ঘদিন ধরেই বেগম খালেদা জিয়া লিভার, কিডনি, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তাঁকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে দলীয় ও পারিবারিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এর আগে নির্বাহী আদেশে দণ্ড স্থগিতের পর তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং চলতি বছরের ৬ মে কাতারের আমিরের পাঠানো এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে দেশে ফেরেন।
‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে রাজনৈতিক মূল্যায়ন
সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছে। স্বৈরতন্ত্র ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণেই তিনি সমর্থকদের কাছে পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
দলীয় নেতাদের মতে, ক্ষমতার চেয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকেই তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো নির্বাচনী আসনে পরাজিত হননি—যা দেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
শোক ও রাজনৈতিক শূন্যতা
বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে বিএনপি, সহযোগী সংগঠন এবং গণতন্ত্রকামী বিভিন্ন মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দলটির পক্ষ থেকে সাত দিনব্যাপী শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সারাদেশে দোয়া মাহফিল ও কোরআন খতমের আয়োজন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটাল। বিরোধী রাজনীতির অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা পূরণ করতে সময় লাগবে। ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের সংগ্রামী নেত্রী এবং ‘আপসহীন’ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।