১️. “৪০ শিশুর শিরশ্ছেদ” — মিথ্যার সূচনা
অক্টোবর ২০২৩-এ ইসরায়েলি মিডিয়া দাবি করে হামাস ৪০টি শিশুর মাথা কেটে ফেলেছে। এই দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।
তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি প্রথমে খবরটি খণ্ডন করে জানায়—ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিজেই এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ দিতে পারেনি।
পরে অনুসন্ধানী মাধ্যম Grayzone প্রকাশ করে যে, এই মিথ্যা ছড়িয়েছিলেন ডেভিড বেন জায়ন, যিনি অবৈধ দখলদার ইসরায়েলি সেনা ইউনিটের কমান্ডার ও পরিচিত উগ্রবাদী বসতি স্থাপনকারী।
এমনকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ভুলভাবে দাবি করেন যে তিনি “ছবিগুলো দেখেছেন”—যা হোয়াইট হাউস পরে প্রত্যাহার করে।
২️. “গণধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন” — প্রমাণহীন অভিযোগ
ইসরায়েল দাবি করে হামাস ৭ অক্টোবর গণধর্ষণ চালিয়েছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ZAKA–এর সদস্য চেইম ওটমাজগিন প্রথমে দাবি করলেও পরে Associated Press–কে বলেন যে এটি ছিল কেবল “অনুমান”।
অন্যদিকে, প্রমাণ রয়েছে যে ইসরায়েলি সেনারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন সহিংসতা চালিয়েছে—পুরুষ ও নারী উভয়ের বিরুদ্ধে।
৩️. “হামাস বেসামরিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে” — বাস্তবতা উল্টো
ইসরায়েল বহু বছর ধরেই এই দাবি করে আসছে, কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই।
গাজায় আল শিফা হাসপাতালে “হামাস টানেল” থাকার দাবি করেও ইসরায়েল কোনো ছবি, ভিডিও বা সাক্ষ্য দিতে পারেনি।
বিপরীতে, চিকিৎসক ড. মাডস গিলবার্ট জানান, তিনি ১৬ বছর ধরে ওই হাসপাতালে কাজ করেছেন—কোনো সামরিক কার্যক্রম দেখেননি।
অন্যদিকে, ভিডিও প্রমাণে দেখা গেছে, ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছে এবং “নিরাপদ অঞ্চল”গুলোতে হামলা চালাচ্ছে।
৪️. “হামাস ত্রাণ চুরি করছে” — নিজেই স্বীকার করল ইসরায়েল
২০২৫ সালের মার্চ থেকে ইসরায়েল গাজায় মানবিক ত্রাণের ওপর পূর্ণ অবরোধ দেয় এবং হামাসকে চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
কিন্তু USAID ২৫ জুলাই জানায়—কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে হামাস ত্রাণ চুরি করেছে।
একদিন পর ইসরায়েলি সেনারাও New York Times–কে একই কথা বলে।
এরপর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বীকার করেন, গাজায় ত্রাণ লুট করছে এমন কিছু অপরাধী গোষ্ঠীকে ইসরায়েলই অর্থ দিচ্ছে।
৫️. “সাংবাদিকরা হামাসের হয়ে কাজ করছে” — হত্যার অজুহাত
গণহত্যা শুরু থেকেই ইসরায়েল দাবি করে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা হামাসের হয়ে কাজ করছে।
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ইসরায়েল ছয়জন Al Jazeera সাংবাদিককে অভিযুক্ত করে—তাদের সবাই পরে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
আরেক ঘটনায়, নাসের হাসপাতালে বোমা হামলায় পাঁচ সাংবাদিক নিহত হন। ইসরায়েল দাবি করে সেখানে “হামাসের ক্যামেরা” ছিল।
পরে Reuters তদন্তে প্রমাণ করে ক্যামেরাটি আসলে তাদেরই ছিল।
এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীকে হত্যা করেছে ইসরায়েল—যা ইতিহাসে নজিরবিহীন।
৬️. “হামাস যুদ্ধবিরতি বাধাগ্রস্ত করছে” — মিথ্যা দায় চাপানো
বাস্তবে হামাস একাধিকবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিয়েছে—কাতার, মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায়ও।
২০২৫ সালের মে মাসে হামাস তিন দফা শান্তিচুক্তি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল, কিন্তু নেতানিয়াহু তা প্রত্যাখ্যান করেন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনা ছয়টি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবই যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়েছে।
এমনকি ইসরায়েলি বন্দিদের পরিবারও অভিযোগ করেছে—নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তিচেষ্টা ব্যাহত করছেন নিজের রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য।
৭️. “ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা অতিরঞ্জিত” — মৃত্যুকে লুকানোর চেষ্টা
ইসরায়েল বারবার ফিলিস্তিনি হতাহতের সরকারি সংখ্যা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কিন্তু জাতিসংঘ ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মতে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৬৭,০০০, আহত প্রায় ১,৭০,০০০—কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছি।
৮️ “আমাদের হামলা অত্যন্ত নির্ভুল” — বাস্তবে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ
ইসরায়েল দাবি করে তাদের টার্গেট কেবল হামাস যোদ্ধা, কিন্তু বাস্তবে গাজার হাসপাতাল, স্কুল, বাজার, আশ্রয়কেন্দ্র—সবখানেই বোমা বর্ষণ করা হয়েছে।
হাজার হাজার নারী, শিশু ও বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায়, এটি “নির্ভুল হামলা” নয়—বরং “সমষ্টিগত শাস্তি” ও যুদ্ধাপরাধ।
৯️. “ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক” — ভয়াবহ প্রচারণা
ইসরায়েলি নেতারা বারবার বলেন তাদের বাহিনী “সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী”। কিন্তু বাস্তবে তারা শিশুদের হত্যা করেছে, কবরস্থান ধ্বংস করেছে, শরণার্থী শিবির বোমায় উড়িয়ে দিয়েছে।
Amnesty International ও Human Rights Watch ইসরায়েলি বাহিনীকে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ইতিমধ্যে নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
অসংখ্য ভিডিও প্রমাণে দেখা গেছে, ইসরায়েলি সৈন্যরা গাজার ঘরবাড়ি লুট করছে, মৃতদেহের ওপর ট্যাঙ্ক চালাচ্ছে, বন্দিদের নির্যাতন করছে এবং এমনকি ধর্ষণ পর্যন্ত করছে।
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুধু রক্তপাত নয়—এটি সত্য ও নৈতিকতার বিরুদ্ধে এক বিশ্বব্যাপী তথ্যযুদ্ধ।
নয়টি বড় মিথ্যা ছড়িয়ে তেল আবিব যেমন নিজের অপরাধ ঢাকতে চায়, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করে রাখতে চায়।
কিন্তু প্রতিটি শিশুর নাম, প্রতিটি ধ্বংসস্তূপের ছবি, প্রতিটি সাংবাদিকের মৃত্যু—প্রমাণ করে দেয়, সত্য শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, মিথ্যা নয়।