বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার সান সিটি থেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ের উডস্টক—সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা সব সময়ই নিজেদের বর্বরতা ঢাকতে বিনোদনকে কাজে লাগিয়েছেন। এখন ইসরায়েলও একই কাজ করছে তাদের প্রাইড প্যারেড, পর্যটন আর ট্রান্সফেস্টিভাল দিয়ে।
গাজা থেকে ইসরায়েলি তরুণরা ছুটে যাচ্ছে গোয়ার পাহাড়ে, উদ্দাম হয়ে ট্রান্সমিউজিকের তালে। এখানে কোনো ফিলিস্তিনি মায়ের সন্তানহারা বিলাপ শোনা যায় না।
কারণ গণহত্যা চলছে অনেক দূরে। আর এটিই মূল উদ্দেশ্য। সামরিক বাহিনীতে কাজ শেষে ইসরায়েলিরা এই ভ্রমণকে বলে “টারমিলা’উত” অর্থাৎ ‘শান্তিপূর্ণভাবে উন্মাদ হয়ে যাওয়া’।
এটি শুধু হিপ্পিদের কাজ নয়।
২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার ইসরায়েলি যুবক সামরিক বাহিনীর চাকরি শেষে এ ধরনের ভ্রমণে যায়। মাত্র কয়েক হাজার ডলারে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এমন সব প্যাকেজ দেয়, যেখানে সব ভুলে থাকা যায়। কারণ সেখানে ফিলিস্তিনিদের কোনো অস্তিত্ব নেই।
অন্যদিকে নোভা মিউজিক ফেস্টিভালে হামলার দুই বছর পর, গাজায় চলমান গণহত্যার মধ্যে, ইসরায়েলে ‘পালিয়ে যাওয়া’র অর্থ বদলে গেছে।
ইসরায়েলিরা ‘পরিস্থিতি’ থেকে বাঁচতে বিদেশে যেতে চায়, যেন দখলদারি শুধু একটু অসুবিধার ব্যাপার বা সাময়িক পরিস্থিতি। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের পালানোর কোনো পথ নেই।
ইসরায়েলিরা তিন বছর ধরে পশ্চিম তীরের চেক পয়েন্টে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর সরকার তাদের হাতে একটি ব্যাকপ্যাক আর টিকিট ধরিয়ে দেয়। এই ভ্রমণ শুধু তাদের কাজের পুরস্কার নয়, বরং তাদের অপরাধগুলোকে একটি ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা, যেন সেগুলো আর ফিরে না আসে।
টারমিলা’উত যে ইসরায়েলের প্রায় বাধ্যতামূলক ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সরকার নিজেই এতে উৎসাহ দেয়, যেমনটি তারা নাগরিকদের ইউরোভিশন বা ব্র্যান্ড ইসরায়েলের মতো অন্যান্য পলায়নের পথগুলোতে করে।
ইসরায়েলের কূটনীতিকরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে আনন্দ আসলে রাজনীতিরই অংশ। ২০০৫ সালে একজন কূটনীতিক বলেছিলেন, ‘আমরা সংস্কৃতিকে প্রচারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখি।’ আরেকজন তো সরাসরিই বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলের কাছে সঠিক হওয়ার চেয়ে আকর্ষণীয় হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ ইসরায়েলি ‘সংস্কৃতি’ রপ্তানি করে তারা এটি প্রমাণ করতে চায় যে হিংসা আর স্বাভাবিক জীবন পাশাপাশি চলতে পারে।
২০০৬ সালে ব্র্যান্ড ইসরায়েল নামে একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প চালু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া। এই কাজে এমন পিআর ফার্মকে যুক্ত করা হয়, যারা আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা বা ভোপাল দুর্ঘটনার পর ইউনিয়ন কার্বাইডের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের জন্য কুখ্যাত ছিল।
প্রথম দিকে তারা আমেরিকান পুরুষদের জন্য ম্যাক্সিম ম্যাগাজিনে ‘ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর নারী’ শিরোনামে সেনাদের আবেদনময়ী ছবি প্রকাশ করত। পরে তারা প্রাইড প্যারেডকে ব্যবহার করে। ২০১১ সাল নাগাদ ইসরায়েলি পর্যটন বোর্ড তেল আবিবকে সমকামী পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা হিসেবে তুলে ধরতে ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে। এই ‘পিংকওয়াশিং’ (pinkwashing) এখন রাষ্ট্রের নীতিতে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ইসরায়েলিদের আকর্ষণীয় এবং ফিলিস্তিনিদের পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখায়।
পার্টি, প্যারেড আর ফেস্টিভালগুলোর আড়ালে যে সত্যিটা সামনে চলে আসে, সেটা হচ্ছে ইসরায়েল আনন্দ উদযাপনকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকাও একই কাজ করেছিল।
এখন গোয়াতেও ইসরায়েলি পর্যটকদের বিশেষ অধিকারের মনোভাব নিয়ে স্থানীয় লোকজন বিরক্ত। আমি নিজেও এর সাক্ষী। যখন আমি দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের একটি অবৈধ বসতির পাশে থাকতাম, তখন ইসরায়েলিরা প্রায়ই বলত, আমরা কি শুধু একটু মজা করতে পারি না? এই কথাটি ইসরায়েলি সমাজের এক ধরনের অন্ধত্ব বা অপরিপক্বতা তুলে ধরে—যুদ্ধ করেও শান্তি চাওয়া আর অন্যদের মুছে দিয়ে নিজেরা আনন্দে মেতে থাকা। তাদের কাছে আনন্দও একটি বর্ণবাদী ব্যবস্থা, যা শুধু একদল মানুষের জন্য, আর অন্যদের কাছ থেকে যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলিরা ভাবে, তাদের আনন্দ তাদের নির্দোষ থাকার প্রমাণ। কিন্তু অন্যের কষ্টের ওপর বানানো আনন্দ কখনো সত্যিকারের আনন্দ হতে পারে না, আর তা বেশিদিন টিকবেও না।
আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর : সাঈদ জুবেরী
লেখক : আইরিশ-পাকিস্তানি লেখক ও সম্পাদক, দ্য নিউ আরব।