← Back

কৈলাস পর্বত: যে শৃঙ্গ আজও পড়েনি কারও পদচিহ্ন

ধর্মীয় মহিমা, কিংবদন্তি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে অদ্যাবধি কেউ পৌঁছাতে পারেননি কৈলাস পর্বতের চূড়ায়

বিশেষ প্রতিনিধি
কৈলাস পর্বত
ছবিঃ কৈলাস পর্বত
বিশ্বের প্রায় সব উচ্চতম শৃঙ্গই মানব পদচারণায় চিহ্নিত হলেও হিমালয়ের অন্তর্গত কৈলাস পর্বত রয়ে গেছে ব্যতিক্রম। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকে আসা মানুষ সেখানে উঠতে পারেননি। এর কারণ কেবল পাহাড়ি দুর্বোধ্যতা নয়, বরং এর অগাধ ধর্মীয় মর্যাদা, কিংবদন্তির বার্তা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিষেধাজ্ঞা।

দেবতাদের আবাসভূমি

কৈলাস পর্বতকে চারটি প্রধান ধর্ম—হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মে—অপরিসীম পবিত্র হিসেবে মান্য করা হয়।

হিন্দুধর্মে এটিকে ধ্বংস ও পুনর্জন্মের দেবতা মহাদেব শিবের আবাসভূমি ধরা হয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, কৈলাসেই শিব ও পার্বতীর চির আবাস।

বৌদ্ধধর্মে এটি দেবতা দেমচকের স্থান, যিনি বুদ্ধ অক্ষোভ্যের প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচিত। বৌদ্ধ ভিক্ষু ও তীর্থযাত্রীরা কৈলাসকে মহাজাগতিক শক্তির কেন্দ্র বলে মানেন।

জৈনধর্মে কৈলাস ‘অষ্টপদ’ নামে পরিচিত, যেখানে প্রথম তীর্থংকর ঋষভদেব মোক্ষলাভ করেছিলেন।

বন ধর্মে, যা তিব্বতের প্রাচীনতম আধ্যাত্মিক ধারা, কৈলাসকে পুরো অঞ্চলের আত্মা ও সর্বাধিক পবিত্র স্থান হিসেবে ধরা হয়।

এই ধর্মীয় মহিমার কারণে কৈলাসের চূড়ায় আরোহণকে দেবতাদের প্রতি অবমাননা ও মহাপাপ হিসেবে দেখা হয়। তাই চীন সরকার (যাদের নিয়ন্ত্রণে এলাকা অবস্থিত) আনুষ্ঠানিকভাবে যেকোনো ধরনের আরোহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।

মিলারেপার কিংবদন্তি: কেন উঠা যাবে না

তিব্বতীয় এক বিখ্যাত কিংবদন্তি কৈলাসকে আরোহণের অযোগ্য বলে প্রতিষ্ঠা করেছে। বৌদ্ধ যোগী মিলারেপা এবং বন ধর্মের পুরোহিত নারো বনচুং এক প্রতিযোগিতায় নামেন—কে আগে কৈলাসের চূড়ায় পৌঁছাবেন।

নারো বনচুং তার জাদুকরী ঢোল বাজিয়ে শীর্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঠিক যখন তিনি চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে যান, তখন ধ্যানরত মিলারেপা হঠাৎ আলো বিকিরণ করে এক নিমিষে চূড়ায় অবস্থান নেন। এভাবেই তিনি বিজয়ী হন।

কথিত আছে, মিলারেপার সেই জয় কৈলাসের শিলায় স্থায়ী দাগ তৈরি করে, যা আজও “মিলারেপার পদচিহ্ন” নামে পরিচিত। কিংবদন্তি এই বার্তাই দেয়: কৈলাস কোনো শারীরিক জয় করার বস্তু নয়, এটি আত্মিক শ্রদ্ধার স্থান।

কোরার আধ্যাত্মিক যাত্রা

কৈলাসে শারীরিক আরোহণ না করে ভক্তরা বেছে নেন ভক্তিপূর্ণ কোরা বা পরিক্রমা। এটি প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এক পদযাত্রা, যা ১৫ হাজার ফুট উচ্চতার গড়ে সম্পন্ন হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই পরিক্রমা জীবনের পাপ মোচন করে ও আত্মিক মুক্তি দেয়। অনেক ভক্ত হাঁটুর উপর ভর দিয়ে কিংবা শুয়ে-পড়ে প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পন্ন করেন, যা তাদের কাছে সর্বোচ্চ ভক্তির প্রকাশ।

অল্প কিছু ব্যর্থ প্রচেষ্টা

ইতিহাসে কয়েকজন সাহসী পর্বতারোহী কৈলাস অভিযানে আগ্রহী হয়েছিলেন, তবে প্রত্যেকেই ধর্মীয় মর্যাদার কারণে পিছিয়ে আসেন বা সুযোগ পাননি।

হিউ রাটলেজ (১৯২৬): ব্রিটিশ অভিযাত্রী, যিনি উত্তর দিক পর্যবেক্ষণ করে এটিকে আরোহনযোগ্য বলেছিলেন, কিন্তু প্রচুর তুষার ও দুরূহ পথের কারণে প্রচেষ্টা নেননি।

হারবার্ট টিশি (১৯৩৬): অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহী, যিনি তিব্বতি সরকারের কাছে অনুমতি চান। তাকে জানানো হয়েছিল—“শুধুমাত্র নিরপরাধ ব্যক্তি কৈলাসে উঠতে পারবে, আর সে উঠবে না; ঝড় তাকে স্বয়ং তুলে নিয়ে যাবে।”

রাইনহোল্ড মেসনার (১৯৮৫): কিংবদন্তি ইতালীয় আরোহীকে চীন সরকার অনুমতি দিলেও আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রবল আপত্তির কারণে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান। তার মন্তব্য ছিল—“আমি বিশ্বাসীদের অনুভূতির ওপরে পা দিয়ে উঠতে চাই না।”

অদ্বিতীয় রহস্য ও পবিত্রতার প্রতীক

অতএব, কৈলাস আজও অদম্য রয়ে গেছে। কেবল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে নয়, বরং এর অদ্বিতীয় আধ্যাত্মিক পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে। যে পৃথিবীতে সর্বোচ্চ এভারেস্টসহ সব শৃঙ্গই মানুষের পদচিহ্নে স্পর্শিত, সেই পৃথিবীতেই কৈলাসের অচূড়ান্ততা তাকে করেছে ব্যতিক্রমী।

এটি একদিকে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক, অন্যদিকে মানবজাতিকে মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার কিছু কিছু স্থান মানুষের নয়, দেবতাদের জন্যই সংরক্ষিত।

নামাজের সময়

--:--:--
  • ফজর --:--
  • যোহর --:--
  • আসর --:--
  • মাগরিব --:--
  • এশা --:--
লোড হচ্ছে...

শহর নির্বাচন করুন