দেশে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ঋণের গুণমান ও আদায় ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মাধ্যমে ৭ হাজার ৬৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে। গত বছরের আগস্টে এ অঙ্ক ছিল ৫ হাজার ২১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা; অর্থাৎ বিতরণ বেড়েছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ।
তবে লক্ষ্যমাত্রার হিসাবে চিত্র ভিন্ন। চলতি অর্থবছরে ৫৮টি অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। জুলাই-আগস্টে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৬ হাজার ৮৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থবছরের এক-ষষ্ঠাংশ পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ বিতরণ বাকি। বাকি ১০ মাসে লক্ষ্য পূরণ করতে হলে মাসে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা বিতরণ করতে হবে, যেখানে প্রথম দুই মাসে গড় মাসিক বিতরণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা।
ব্যাংক শ্রেণি অনুযায়ী মোট বিতরণে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে, ২ হাজার ৫১৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা বা ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো দিয়েছে ১ হাজার ৭১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলো ১ হাজার ২৮৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হারে এগিয়ে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক (২৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ); রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অর্জন ৯ দশমিক ৫২ এবং বেসরকারি ব্যাংকের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
ঋণের গুণমান নিয়ে প্রতিবেদনে মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। এক বছরে কৃষিঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ অংশ ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে ২২ হাজার ৯৬৮ কোটি থেকে ২১ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকায় নেমেছে। বিশেষায়িত ব্যাংকে তা কমেছে ৯ দশমিক ৬৭ এবং বেসরকারি ব্যাংকে ২৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়েছে, আর ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ৩৮৭ কোটি ৭৫ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৩৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, প্রবৃদ্ধি ১১৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
শ্রেণীকৃত ঋণ এক বছরে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে ১৯ হাজার ৪৯৭ কোটি থেকে ১৯ হাজার ১৭ কোটি টাকায় নেমেছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে তা ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ৯১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে (৪৫৯ কোটি ৬৬ লাখ থেকে ৮৭৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা)।
দীর্ঘমেয়াদি তথ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শ্রেণীকৃত কৃষিঋণ ছিল ৫ হাজার ২৪০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৩ গুণ। একই সময়ে বিতরণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে (২০ হাজার ৯৯৮ কোটি থেকে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শ্রেণীকৃত ঋণ ছিল ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা প্রায় ১৯ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকায় ওঠে; প্রতিবেদনে এ উল্লম্ফনের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। প্রবাহ ও স্থিতির হিসাব আলাদা হওয়ায় এ দুইয়ের প্রবৃদ্ধির সরাসরি তুলনা করে ঋণমানের অবনতি নির্ধারণ করা যায় না বলে বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে।