দেশের ব্যাংক খাত আয়ের সংকটে পড়েছে। কার্যক্রম থেকে মুনাফা হলেও প্রভিশন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণের চাপে খাতটি এখন নিট লোকসানে। ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ ব্যাংকগুলোর আয়ের পথ আটকে রেখেছে। এখন আইন সংশোধন, ঋণ আদায়ের নতুন কাঠামো ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে সেই বোঝা কমানোর চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। কিন্তু নিট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায়। সম্পদ থেকে প্রাপ্তি (আরওএ) ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং মূলধনের ওপর প্রতিদান (আরওই) ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ। ২২টি ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে চলছে, যার মোট পরিমাণ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
চার আইন সংশোধন করে ব্যাংক খাতকে লাভজনক করার চেষ্টা করছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এতে এই খাত থেকে করপোরেট কর আদায়ের হারও বাড়বে। দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংকের দায় ও সম্পদ নতুন গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমানত সুরক্ষার সীমা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু হয়েছে, যার আওতায় ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ মূল্যায়ন করে ঝুঁকি রেটিং দেওয়া হবে। ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে কিছু সূচকে উন্নতির চিত্রও আছে। গত বছরের জুনের তুলনায় শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১ দশমিক ৬২ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। আন্তঃব্যাংক কল মানি রেট গত বছরের ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে নেমে ২৭ সেপ্টেম্বর ৮ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে তারল্যের ঘাটতি নেই।
তবে চিত্রটি পুরোপুরি স্বস্তির নয়। গত তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ আরও প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। মূলধন-সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার বেশি জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলো কত দ্রুত লোকসান থেকে বেরোতে পারবে, তা নির্ভর করবে আইন সংস্কারের গতি ও বাস্তবায়নের দৃঢ়তার ওপর।