নেত্রকোনায় ৭ বছরে বজ্রপাতে ৭৯ জনের মৃত্যু, কার্যকর সরকারি পদক্ষেপের অভাব
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ছে, তবে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।
বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও বাংলাদেশে এখন অন্যতম বড় ও দ্রুত বর্ধনশীল প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম ‘বজ্রপাত’। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে প্রতিনিয়ত বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটছে। গত সাত বছরে নেত্রকোনা জেলায় বজ্রপাতে ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে, তবে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি। নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এ অঞ্চলের ভয়াবহ পরিস্থিতি উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬ জন বজ্রপাতে মারা যান। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুম এপ্রিল ও মে মাসে কৃষকেরা বেশি বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন। কৃষক আরিফ চৌধুরী বলেন, অপরিকল্পিতভাবে স্থান নির্বাচন ও তদারকি না থাকায় কোটি কোটি টাকার প্রকল্প কোনো কাজে আসেনি। আবুল হাসেমের মতো অনেক কৃষক জীবন বাঁচাতে গিয়েও বাধ্য হয়ে পেটের তাগিদে খোলা হাওরে নামতে বাধ্য হচ্ছেন।
২০২২ সালে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৩৪টি ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়, যার প্রতিটি গঠনে খরচ হয় ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা। কিন্তু অধিকাংশ বজ্রনিরোধক দণ্ড বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা লোকালয়ে স্থাপন করা হয়েছে, যদিও এগুলো হাওরের জনশূন্য ও খোলা প্রান্তরে বসানোর কথা ছিল। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাত্র দুই বছরের মাথায় অধিকাংশ যন্ত্রই বিকল হয়ে গেছে। কোনো কোনো স্থানে যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে এখন শুধু লোহার খুঁটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। নেত্রকোনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং এগুলো বেশ ব্যয়সাপেক্ষ।
বজ্রপাত প্রতিরোধে গৃহীত তালগাছ রোপণ প্রকল্পও পরিচর্যার অভাবে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের চারাগুলোর পরিচর্যা না করায় সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব এখন আর নেই। জিয়া পরিষদের জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি মো. সানাউল হক মাসুম মনে করেন, সুনির্দিষ্ট তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় নেওয়া সরকারি প্রকল্পগুলো ভেস্তে যাচ্ছে।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, প্রাণহানি কমাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হাওরে বজ্রপাতকালীন সুরক্ষায় স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টারের মতো আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকার বর্তমানে হাওরে বৃষ্টিপাতের সময় কৃষকদের আশ্রয়ের জন্য শেড বা বিশেষ ‘আশ্রয়কেন্দ্র’ চালুর পরিকল্পনা করছে।