বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

জাতীয় পার্টির ভেতরের কূটনীতি ও ভারতের হস্তক্ষেপ: সাকিব রহমানের স্বীকারোক্তি

জাতীয় পার্টির ভেতরের কূটনীতি ও ভারতের হস্তক্ষেপ: সাকিব রহমানের স্বীকারোক্তি
ছবি: নেত্রনিউজ

নেত্র   নিউজে দেওয়া সাকিব রহমান এর মতামতটি বাংলায় প্রকাশ করা  হলো

সাকিব রহমান: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রোগ্রেস ম্যাগাজিন-এর সম্পাদক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার।

শৈশব থেকেই আমার রাজনীতির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। যখন অবশেষে তরুণ আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে স্থিত হতে শুরু করি, তখন চাইছিলাম আমার রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে বাস্তব প্রয়োগে কাজে লাগাতে। জাতীয় পার্টি বেছে নেওয়ার পেছনে কারণ ছিল এইচ. এম. এরশাদ ও জি. এম. কাদের—যাঁরা দুজনই আমার বাবার মামা। আমার বাবা ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক, যিনি রাজনীতির কাছাকাছি কখনোই যাননি—ঢাকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডে তাঁর অকালমৃত্যু পর্যন্তও। আমি ভেবেছিলাম, যদি রাজনীতিতে অবদান রাখি, তবে এই দলই হবে স্বাভাবিক পছন্দ। এখানে কয়েকজন আত্মীয়ও আছেন, যা একজন রাজনৈতিক নবাগত হিসেবে আমার জন্য পরিচিত পরিবেশ তৈরি করবে। পাশাপাশি এ দলকে পুনর্গঠন করার সুযোগও ছিল।

২০১৯ সালে আমি প্রথম কাদেরকে (যাকে আমি “দাদু” বলে ডাকি) আমার আগ্রহের কথা জানাই। আমার কর্মজীবন সম্পর্কে জেনে কো-চেয়ারম্যান পরামর্শ দেন যে আন্তর্জাতিক বিষয়ক পদটি আমার জন্য মানানসই হবে এবং তিনি বিশেষভাবে আমাকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক (IAS) পদের জন্য সুপারিশ করেন। আমি আবেদন করার পর কাদের প্রাথমিক অনুমোদন দেন, আর পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদ তাঁর বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেন। (দলীয় সংবিধানের বিতর্কিত ধারা ২০(১)(১)(ক) অনুযায়ী চেয়ারম্যান যেকোনো পদ সৃষ্টি বা বিলোপ করতে পারেন, যাকে ইচ্ছা নিয়োগ বা অপসারণ করতে পারেন এবং প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো পরিবর্তন আনতে পারেন।) আমি দলকে সঠিক পথে নেওয়ার আদর্শিক স্বপ্ন নিয়ে যোগ দিয়েছিলাম।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে এরশাদের মৃত্যু হলে ডিসেম্বর মাসে দলীয় কাউন্সিল হয়। সেখানে কাদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, আর আমার পদটিও স্থায়ী হয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০২১ সাল থেকে আমি পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করি। আমার দায়িত্ব ছিল মূলত বিদেশে জাতীয় পার্টির কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা এবং বাংলাদেশে কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে দলের প্রতিনিধিত্ব করে যোগাযোগ রাখা।

আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল বিদেশে শাখা রাখতে পারে না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সব বড় দলই বিদেশে প্রবাসীদের দিয়ে “কমিটি” গঠন করেছে, যেটি আইনবিরুদ্ধ হলেও প্রবাসীদের অনুদান সংগ্রহের কারণে চলমান ছিল। কাদেরের একজন বিশ্বস্ত লোক দরকার ছিল, কারণ তিনি জানতেন না যে এরশাদের ঘনিষ্ঠ অনেক নেতা আগে প্রবাসী কমিটির অনুমোদন দিয়ে টাকা নিয়েছেন, যা দলীয় হিসাবেই জমা হয়নি। পুনর্গঠনের সময় আমি নিশ্চিত করেছিলাম যে শুধুমাত্র কাদেরের সম্মতিপ্রাপ্তদেরই নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে এবং সব লেনদেনের রেকর্ড সঠিকভাবে নথিভুক্ত আছে। অফিসে আমি আলাদা একটি ফাইলও সংরক্ষণ করেছিলাম, যাতে অনুদানের রসিদ ও প্রমাণপত্র রাখা ছিল।

আমি ভালো করেই জানতাম, আমার নিয়োগ ছিল স্বজনপ্রীতির ফল। কাউন্সিলের অনুমোদন থাকলেও বিষয়টি মূলত পরিবারের সূত্রে হয়েছিল। এর ফলে আমি চেয়ারম্যানের কাছে সবসময় নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার পেতাম, যা দলের অন্যদের কাছে আমাকে বিশেষ সুবিধাভোগী করে তুলেছিল। তাই আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করতে, যাতে কেউ আমাকে অযোগ্য বা অবাঞ্ছিত ভাবে না দেখে।

২০২২ সালের মে মাসে আমি ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনারের বাসভবনে এক নৈশভোজে অংশ নিই। সেখানে মূলত একাডেমিক, শিল্পী ও নাগরিক সমাজের ব্যক্তিরাই আমন্ত্রিত ছিলেন। আমি একাডেমিক হওয়ার পাশাপাশি দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক হওয়ায় এমন কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া আমার দায়িত্বের অংশ ছিল। কিন্তু হাইকমিশনারের সঙ্গে আমার একটি ছবিই ভারতের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যা সরাসরি দলের চেয়ারম্যানকে জানানো হয় ভারতীয় হাইকমিশনের এক প্রতিনিধির মাধ্যমে।

যখন দলের ভেতরে বিশেষ করে তরুণদের কাছে আমি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পক্ষে পরিচিত হতে শুরু করেছি, তখন কাদের আমাকে জানালেন যে ভারতীয় হাইকমিশনের রাজনৈতিক সচিব অনিমেষ (আইএফএস ২০১১ ব্যাচ, ইউপিএসসি’র মাধ্যমে যোগদানকারী) আমার পাকিস্তান হাইকমিশনারের সঙ্গে ছবিতে অসন্তুষ্ট। ভারতীয় কূটনীতিকের পাকিস্তানবিরোধী অবস্থান স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু কোনো ভারতীয় কূটনীতিক কেন ও কিভাবে একটি বাংলাদেশি দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক নিয়ে মন্তব্য করবে? আর তার মন্তব্য কেন বা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন কাদের বা অন্য কোনো বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান?

বছরের পর বছর ধরে জাতীয় পার্টি ও এর চেয়ারম্যানের ওপর ভারতের প্রভাব নিয়ে গুঞ্জন চলছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার দোসর হিসেবে কিংবা বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেও এ অভিযোগ ওঠে। কাদের ভারত সফরে ভারতীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে কী আলোচনা করেছেন, তার বিস্তারিত কখনোই কারো সঙ্গে ভাগ করেননি। তবুও আমি স্তম্ভিত হয়েছিলাম যখন শুনলাম অনিমেষের হস্তক্ষেপে কাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। অনিমেষ কাদেরকে পাঠানো একটি টেক্সট, যা কাদের আমাকে ফরোয়ার্ড করেছিলেন, সেখানে লেখা ছিল: “স্যার, বিষয়টি আমাদের দেশে গুরুত্বসহকারে নোট করা হয়েছে। বাকিটা আপনার ব্যাপার। রিগার্ডস।” কাদের আমাকে জানালেন, তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় আমাকে অপসারণ করতে বলা হয়েছে।

আমাকে শুধু IAS পদ থেকে সরানো হয়নি, দলীয় ওয়েবসাইট ও তথ্যপ্রযুক্তি সিস্টেম থেকেও মুছে ফেলা হয়। আমার প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করা হয়। কাদের আমাকে একদিকে বলেন কিছুদিন কূটনৈতিক মহল থেকে দূরে থাকতে, এবং প্রতিশ্রুতি দেন পরিস্থিতি শান্ত হলে আমাকে আবার ফিরিয়ে আনা হবে। অন্যদিকে, একটি বরখাস্তপত্র, যা নাকি অনিমেষকে দেখানো হয়েছিল তাঁকে আশ্বস্ত করার জন্য, কখনো প্রকাশ পায়নি। অর্থাৎ আমার অপসারণের আনুষ্ঠানিক চিঠিটি ভারতীয় কূটনীতিক দেখেছেন, কিন্তু আমি বা বাংলাদেশের মানুষ কেউ দেখিনি।

২০২৩ সালের মার্চ নাগাদ আমি লজ্জা ও হতাশার কারণে দল থেকে দূরে সরে যাই। তখনই, আমাকে অপসারণের দশ মাস পর, কাদের আমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু এ পদ ছিল কার্যত অলংকারস্বরূপ। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমাকে ফোনে জানানো হয় যে নিয়োগটি স্থগিত করা হয়েছে, কারণ ভারতীয় হাইকমিশন এখনো আমার বিষয়ে আপত্তি জানাচ্ছে। ভারতীয়দের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো ছিল কাদেরের একচ্ছত্র অধিকার। আমার সময়ে আমি একবারও এমন বৈঠকে অংশ নিইনি কিংবা কিছু জানতে পারিনি। হয়তো তাতেই বোঝা যেত কেন কাদের দিল্লির প্রতি এমন অনুগত। ভারতের অদৃশ্য ও অদম্য প্রভাবের মুখে, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে আমি একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে (দৈনিক ডেইলি স্টার প্রকাশিত) জাতীয় পার্টি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা দিই। তারপর থেকে আমি আর দলে ফিরিনি, ফিরবও না।

এই স্বীকারোক্তি এসেছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার তাগিদ থেকে। আমার সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনে আমি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি। আমাকে অন্যায়ভাবে অপসারণ করা হয়েছে—এখন আমি তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করছি। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও এ সত্য জানে। যদিও আমি কয়েকজনের দিকে আঙুল তুলতে পারি, যারা ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগসাজশে আমার অপসারণে ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কাদের। তিনি নিখুঁতভাবে একজন দালালের ভূমিকা পালন করেছেন। আমার অপসারণের পর আমি বুঝলাম, এ দলটির কখনোই নিজস্ব কোনো পরিচয় ছিল না। এটি কেবল বহিরাগত শক্তির—আওয়ামী লীগ ও দিল্লির—অজুহাত পূরণের মাধ্যম ছিল।

আমি আশা করি, একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল ও তার চেয়ারম্যানের ভেতরের কারসাজি উন্মোচন জনস্বার্থে কাজে আসবে। তবে কাদের ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে এসব তথ্য জানার পর বাংলাদেশের জনগণ কীভাবে বিচার করবেন, সেটি সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যাপার।