মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬
নোবেল পুরস্কার ২০২৬

আলো দিয়ে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের কৌশল: চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

এককোষী শৈবাল থেকে জটিল মস্তিষ্কের চিকিৎসা—আলোর সুইচে নিউরন নিয়ন্ত্রণের অবিশ্বাস্য গল্প

চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল ২০২৬ বিজয়ী কার্ল ডিসেরোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেয়র্গ নাগেল
ছবি: চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল ২০২৬ বিজয়ী কার্ল ডিসেরোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেয়র্গ নাগেল

চিকিৎসা ও শারীরবিদ্যায় ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন তিন প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী ও বায়োফিজিসিস্ট। আলোর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ বা নিউরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বৈপ্লবিক পদ্ধতি ‘অপটোজেনেটিক্স’ (Optogenetics) এবং আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল (Light-gated ion channels) উদ্ভাবনের জন্য তাঁদের এই সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করা হলো।

আজ, সোমবার আন্তর্জাতিক মান সময় অনুযায়ী দুপুরে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের বিখ্যাত ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম প্রকাশ করে।

যৌথভাবে নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানী

পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন বিজ্ঞানী হলেন:

কার্ল ডিসেরোথ (Karl Deisseroth): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বায়োপ্রকৌশলী ও স্নায়ুবিজ্ঞানী (বয়স: ৫৪ বছর)। তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাওয়ার্ড হিউজ মেডিকেল ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা ও গবেষণারত।

পিটার হেগেম্যান (Peter Hegemann): জার্মানির হামবোল্ট ইউনিভার্সিটি অব বার্লিনের খ্যাতনামা বায়োফিজিসিস্ট (বয়স: ৭১ বছর)।

গেয়র্গ নাগেল (Georg Nagel): জার্মানির উর্জবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট গবেষক (বয়স: ৭৩ বছর)।

পুরস্কারের আর্থিক মূল্য হিসেবে নোবেলজয়ীরা মোট ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার) যৌথভাবে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবেন।

গবেষণার পটভূমি: স্নায়ুবিজ্ঞানের শতবর্ষের চ্যালেঞ্জ

বিজ্ঞানীদের জন্য প্রাণীর জীবন্ত মস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরনের মধ্য থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো নিউরন কীভাবে আমাদের আচরণ, স্মৃতি, অনুভূতি কিংবা ভয় ও বিষণ্ণতার ওপর প্রভাব ফেলে, তা পর্যবেক্ষণ করা দীর্ঘকাল ধরে এক দুরূহ চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রচলিত উদ্দীপনা পদ্ধতিতে আশপাশের সমস্ত নিউরন একসঙ্গে উত্তেজিত হয়ে পড়ায় একক কোনো নিউরনের ভূমিকা নিখুঁতভাবে বোঝা সম্ভব হতো না।

শৈবালের আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন ও চ্যানেলরোডোপসিন

জার্মান গবেষক পিটার হেগেম্যান ও গেয়র্গ নাগেল সবুজ এককোষী শৈবাল (Chlamydomonas reinhardtii) নিয়ে গবেষণাকালে এক অভূতপূর্ব তথ্য আবিষ্কার করেন। তাঁরা জানান, এই শৈবালে আলো গ্রহণকারী প্রোটিন ‘চ্যানেলরোডোপসিন’ (Channelrhodopsin) বিদ্যমান। এই বিশেষ প্রোটিনটি সরাসরি আলোকরশ্মি শোষণ করে নিজেকে একটি আয়ন চ্যানেল হিসেবে উন্মুক্ত করে এবং শৈবাল কোষের ভেতরে তড়িৎ আধান সৃষ্টি করে কোষকে আলো অভিমুখে চলতে সাহায্য করে।

সুইচের মতো আলোর ব্যবহার ও ‘অপটোজেনেটিক্স’

পরবর্তীতে ২০০৫ সালের দিকে মার্কিন বায়োপ্রকৌশলী ও স্নায়ুবিজ্ঞানী কার্ল ডিসেরোথ এবং তাঁর দল এই পদ্ধতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূলধারায় নিয়ে আসেন। ডিসেরোথ শৈবালের সেই চ্যানেলরোডোপসিন প্রোটিনের জিনকে ল্যাবরেটরিতে সংবেদনশীল স্নায়ুকোষে যুক্ত করে তা একটি বিদ্যুৎ-সুইচের মতো ব্যবহার করার নিখুঁত কৌশল উদ্ভাবন করেন।

ফাইবার অপটিকসের সাহায্যে কেবল নির্দিষ্ট একটি নিউরনের ওপর নীল আলো ফেলে কৃত্রিমভাবে আলো-সংকেত তৈরি করা সম্ভব হয়। পরবর্তীতে জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে আলোক-রশ্মি ফেলে মুহূর্তের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট কাজ বা আচরণ সক্রিয় (On) অথবা বন্ধ (Off) করার সক্ষমতা অর্জন করেন তিনি। এটিই চিকিৎসা ও ব্রেইন সায়েন্সের ইতিহাসে ‘অপটোজেনেটিক্স’ নামে পরিচিত লাভ করে।

কেন এই আবিষ্কার যুগান্তকারী?

নোবেল কমিটির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অপটোজেনেটিক্সের আবিষ্কার আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

মস্তিষ্কের জটিল রহস্য উন্মোচন: মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরের সার্কিট কীভাবে কাজ করে, তা এখন আলোর মাধ্যমে লাইভ পর্যবেক্ষণ করা যায়। আমাদের কোনো সুনির্দিষ্ট স্মৃতি কীভাবে তৈরি হয় কিংবা কোনো ভীতিকর পরিস্থিতিতে ব্রেইনের কোন কোষটি কীভাবে সচল হয়—তা একদম নির্ভুলভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব হচ্ছে।

জটিল স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় নতুন আশার আলো:

পার্কিনসন্স রোগ: ডোপামিন তৈরি করা স্নায়ু কীভাবে ভেঙে পড়ে তা বোঝার মাধ্যমে সঠিক ওষুধ তৈরিতে অপটোজেনেটিক্স ভূমিকা রাখছে।

মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও বিষণ্নতা: গভীর বিষণ্নতা (Clinical Depression), ভয় এবং আশক্তির পেছনে মস্তিষ্কের নিউরাল সার্কিটের ত্রুটি চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে।

মৃগীরোগ (Epilepsy): খিঁচুনির সময় ব্রেইনের অতিরঞ্জিত কোষীয় সংকেতকে আলোর সাহায্যে দমিয়ে দেওয়ার ওপর সফল গবেষণা চলছে।

অন্ধত্ব দূরীকরণ: অপটোজেনেটিক্স ব্যবহার করে চোখের ক্ষতিগ্রস্ত রেটিনার স্নায়ুকে আলোক-সংবেদনশীল করে আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সাফল্য লাভ করেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, আলো দিয়ে সরাসরি মস্তিষ্কের কোষ নিয়ন্ত্রণের এই বিস্ময়কর আবিষ্কার দীর্ঘমেয়াদে মানবজাতির জটিলতম ব্রেইন ডিজঅর্ডার বা স্নায়বিক ব্যাধি প্রতিরোধে এক নতুন বিপ্লব আনবে।