বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

থাই আদালতের রায় সামনে: প্রধানমন্ত্রী পেতংটার্ন শিনাওয়াত্রার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে

ফোনালাপের অভিযোগে স্থগিত প্রধানমন্ত্রীর পদচ্যুতির সম্ভাবনা, বিশ্লেষকরা বলছেন—‘শিনাওয়াত্রা ব্র্যান্ড শেষের পথে’

 পেতংটার্ন শিনাওয়াত্রা ও তার বাবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাকসিন শিনাওয়াত্রার
ছবি: পেতংটার্ন শিনাওয়াত্রা ও তার বাবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাকসিন শিনাওয়াত্রার (সংগৃহীত)

থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত শুক্রবার স্থগিত প্রধানমন্ত্রী পেতংটার্ন শিনাওয়াত্রার পদচ্যুতি নিয়ে রায় দিতে যাচ্ছে। রায় প্রতিকূলে গেলে এটি হতে পারে শিনাওয়াত্রা পরিবার ও তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য চূড়ান্ত আঘাত।

থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত শুক্রবার দেশটির স্থগিত প্রধানমন্ত্রী পেতংটার্ন শিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে দেওয়া মামলার রায় ঘোষণা করবে। অভিযোগ রয়েছে, কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেন-এর সঙ্গে একটি ফোনালাপে তিনি সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, যা আদালত ‘নৈতিক অসদাচরণ’ হিসেবে পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছে।

রায় যদি প্রতিকূলে যায়, তাহলে মাত্র দুই বছরের মাথায় পেতংটার্নকে পদচ্যুত হতে হবে এবং তিনি হবেন ২০০৮ সালের পর থেকে আদালতের মাধ্যমে পদ হারানো পঞ্চম থাই প্রধানমন্ত্রী।

শিনাওয়াত্রা পরিবারের জন্য কঠিন সময়

৩৯ বছর বয়সী পেতংটার্ন দেশটির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত্রার কন্যা। থাকসিন ২০০৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ১৬ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২০২৩ সালে দেশে ফেরেন। গত সপ্তাহেই তিনি রাজতন্ত্র অবমাননার একটি মামলায় খালাস পেয়েছেন, তবে এখনো তার বিরুদ্ধে থাইল্যান্ডে ফেরার শর্ত লঙ্ঘন সম্পর্কিত আরেকটি মামলা বিচারাধীন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আদালতের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, শিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক ব্র্যান্ড এখন বড় সংকটে। আইএসইএএস–ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের গবেষক নাপন জাতুস্রিপিতাক বলেন,

“শিনাওয়াত্রা ব্র্যান্ড কার্যত শেষ। পেউ থাই দলের জনপ্রিয়তা পুরোপুরি শিনাওয়াত্রা পরিবারের উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পেতংটার্নের কৌশলগত অভিজ্ঞতার অভাব এবং ফাঁস হওয়া ফোনালাপ তাদের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”

রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা

থাই রাজনীতিতে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছে। ২০০৮ সালে থাকসিন-ঘনিষ্ঠ একাধিক প্রধানমন্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে পদচ্যুত করা হয় এবং ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে থাকসিনের বোন ইয়িংলাক শিনাওয়াত্রাকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।

চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধান বিশেষজ্ঞ খেমথং তনসাকুলরুংরুয়াং বলেন,

“এটি কখনোই শুধুই আইনি বিষয় ছিল না। আদালতের সিদ্ধান্ত সবসময় রাজনৈতিক নির্দেশনার ভিত্তিতে এসেছে। এবারও তাই হবে।”

জনঅসন্তোষ ও ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি

পেউ থাই দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে ব্যর্থতা। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, ক্যাসিনো বৈধকরণ ও নগদ অর্থ সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

এ ছাড়া, ২০২৩ সালের নির্বাচনে প্রগতিশীল ‘মুভ ফরোয়ার্ড’ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সেনেটের বিরোধিতায় সরকার গঠন করতে পারেনি। বরং পেউ থাই সামরিক ও রাজতন্ত্রপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় আসে। এর পরই থাকসিন দেশে ফেরেন, যা অনেক সমর্থকের কাছে ছিল ‘সমঝোতা’ ও ‘নৈতিক অবস্থান হারানোর’ সমতুল্য।

সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ

আদালতের রায় প্রতিকূলে গেলে থাইল্যান্ড আবারও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী শুধু ২০২৩ সালের নির্বাচনে মনোনীত প্রার্থীরাই প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে পেউ থাই তাদের শেষ প্রার্থী হিসেবে চাইকাসেম নিতিসিরিকে মনোনীত করতে পারে, তবে রক্ষণশীল জোটের পক্ষ থেকেও শক্তিশালী প্রার্থী উঠে আসতে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রক্ষণশীল-সামরিকপন্থী শক্তি এবারও পেউ থাইকে ক্ষমতায় রাখলেও কেবলমাত্র ‘কনিষ্ঠ অংশীদার’ হিসেবে রাখবে, আর নেতৃত্ব নেবে রক্ষণশীলরা।

‘বাস্তব জীবনের স্কুইড গেম’

প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ পান্নিকা ওয়ানিচ বলেন,

“থাই রাজনীতি এখন এক ধরনের বাস্তব জীবনের স্কুইড গেম—প্রধানমন্ত্রীদের একে একে বাদ দেওয়া হয়, যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড়কে বেছে নেওয়া যায়। নিয়মগুলো আগেই সাজানো, আর গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলো কার্যত অকার্যকর।”