কক্সবাজারের নাজিরারটেকের শুঁটকির বাজারে দোকান আছে অন্তত ৪৫টি। ছুরি, লইট্যা, মাইট্যা, পোপা, সুরমাসহ নানা প্রজাতির শুঁটকি সাজিয়ে রাখা হলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বাজারে এখন কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকার শুঁটকি মজুত রয়েছে। যে দোকানে আগে দিনে ৫০ হাজার টাকার শুঁটকি বিক্রি হতো, সেখানে এখন বিক্রি নেমেছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা করা অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকেরাই তাঁদের প্রধান ক্রেতাদের একটি। কিন্তু শহর থেকে নাজিরারটেকে যাওয়ার পথে সমিতিপাড়া, কুতুববাজার ও পশ্চিম কুতুবদিয়াপাড়া এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক ভাঙাচোরা থাকায় পর্যটকেরা সেখানে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, ১৫ দিন আগেও কোনো কোনো দোকানে দিনে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি হতো; এখন তা ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় নেমেছে। একটি দোকানের মালিক আজিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকঋণ নিয়ে শুঁটকি মজুত করেছিলেন; এখন বিক্রি না হওয়ায় ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসার খরচ চালানো নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন।
কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. শামীম আল ইমরান বলেন, পৌরসভার তহবিল দিয়ে ওই সড়কের ভাঙা অংশ ঠিক করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে জরিপ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থসহায়তা পেলে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।
বিক্রির পাশাপাশি উৎপাদনেও মন্দা চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক উপকূলে ৬০০টির বেশি শুঁটকি মহালে উৎপাদন বন্ধ। তাঁদের ভাষ্য, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে সাগরে আশানুরূপ মাছ ধরা পড়ছে না, তার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার শুঁটকি শ্রমিক এবং ৬ হাজার ট্রলারের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার জেলে ও শ্রমিকের জীবিকা চাপে পড়েছে। সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকতার কামালের ভাষ্য, ১২ হাজারের বেশি নারী শ্রমিকসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন।
কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন জানান, গত বছর মহালগুলোতে ৪০০ কোটি টাকার বেশি শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল; চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার। সাগরে মাছ না পাওয়া গেলে উৎপাদনে আরও ধস নামতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মহালমালিক মো. রাশেদ বলেন, আগে তাঁর মহালে ৪০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন, এখন কাজ করছেন মাত্র কয়েকজন। শ্রমিক সারা খাতুন (৪৫) জানান, অক্টোবরে মা-মেয়ে মাত্র চার দিন কাজ পেয়েছেন এবং মোট আয় হয়েছে চার হাজার টাকা, যা দিয়ে ১০ দিনের খাবারও জোটে না।