একই প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য একেক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একেক রকম ফি নেওয়া হচ্ছে, কোথাও কোথাও পার্থক্য কয়েক গুণ—শুক্রবার প্রকাশিত দৈনিক আমার দেশের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। পরীক্ষার ফি নির্ধারণে অভিন্ন কোনো সরকারি নীতিমালা নেই; পরিস্থিতি সামলাতে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিবেদনের ফি ও খরচের হিসাব একটি পত্রিকার অনুসন্ধাননির্ভর; অন্য কোনো সূত্রে তা যাচাই করা যায়নি।
সরাসরি খরচ কম, ফি বহু গুণ
রাজধানীর কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বায়োকেমিস্ট ও টেকনিশিয়ানরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পত্রিকাটিকে যে হিসাব দিয়েছেন, তাতে কিডনির কার্যকারিতা দেখার সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষায় রি-এজেন্টসহ সরাসরি খরচ ১২ থেকে ১৭ টাকা, অথচ হাসপাতালে নেওয়া হয় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। লিভারের এসজিপিটি পরীক্ষার খরচ ১৫ থেকে ২০ টাকা বলে তাঁদের দাবি; সেখানে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ফি ৫০০ টাকা, পদ্মা ডায়াগনস্টিকে ৪০০ টাকা, আর সরকারি মুগদা হাসপাতালে ৭০ টাকা।
একই হিসাবে হেপাটাইটিস বি শনাক্তের এইচবিএসএজি পরীক্ষায় খরচ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা হলেও ফি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ভিটামিন ডি পরীক্ষার খরচ ২২০ থেকে ৬৫০ টাকা, অথচ পপুলারে ফি ৪ হাজার এবং ইবনে সিনায় ২ হাজার ২৫০ টাকা। ইউরিক অ্যাসিড পরীক্ষায় ২০ থেকে ৩০ টাকা খরচের বিপরীতে নেওয়া হয় ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা। রোগীদের অভিযোগ, কোনো কোনো পরীক্ষায় খরচের ২০ থেকে ৪০ গুণ পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
মালিকপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম আমার দেশকে বলেছেন, যন্ত্রপাতি, রি-এজেন্ট, ভবন, অবস্থান ও জনবলের খরচ যোগ করে মুনাফাসহ ফি ঠিক হয়, তাই প্রতিষ্ঠানভেদে পার্থক্য স্বাভাবিক। মুক্তবাজারে সবার জন্য এক ফি সমীচীন নয় বলে সংগঠনটির মত; তবে মান ও সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিবিন্যাস করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ একাডেমি অব প্যাথলজিস্টের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন আহমদের মতে, সরকারি-বেসরকারি ফিতে পার্থক্য থাকবেই, তবে ফি কীভাবে সহনীয় করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা দরকার।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান পত্রিকাটিকে বলেছেন, রোগনির্ণয় কেন্দ্রের সঙ্গে চিকিৎসক ও দালালদের কমিশনভিত্তিক চুক্তি আছে, আর বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিধিমালার ঘাটতি এ সমস্যার বড় কারণ। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. দবির উদ্দিন আহমেদ মূল সমস্যা হিসেবে তদারকির অভাবের কথা বলেছেন।
নীতিমালার সুপারিশ চেয়েছে মন্ত্রণালয়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নূরুল ইসলাম আমার দেশকে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ফি ও রোগীদের ভোগান্তির বিষয়ে তাঁরা অবগত; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করণীয় ঠিক করতে অধিদপ্তরের কাছে সুপারিশ চেয়েছে। শিগগির উপকমিটি ও বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর একটি নীতিমালার সুপারিশ সরকারের কাছে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
নির্দিষ্ট পরীক্ষার দাম বেঁধে দেওয়ার নজির অবশ্য আছে। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু শনাক্তের এনএস১ পরীক্ষার সর্বোচ্চ ফি ৩০০ টাকা, আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার ৩০০ টাকা এবং সিবিসির ৪০০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল; সেই নির্দেশনা ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর ছিল।