সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬

শেখ মুজিবকে ১৯৬১ সালে ভারতের আইবি ‘রিক্রুট’ করেছিল: ভারতীয় ইতিহাস-গবেষক ইকবাল চাঁদ মালহোত্রা

প্রতিরক্ষাবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দাবিটির পক্ষে মালহোত্রার সরাসরি বক্তব্য বা কোনো নথি নেই, আর এক ভারতীয় কূটনীতিকের স্মৃতিকথা বলছে, কোনো ভারতীয় কর্মকর্তার সঙ্গে মুজিবের প্রথম বৈঠক হয়েছিল ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে।

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) ১৯৬১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে রিক্রুট করেছিল এবং পরে নির্বাচনী রাজনীতিতে তিনি ভারতের সমর্থন পেয়েছিলেন। এমন দাবি করেছেন ভারতীয় লেখক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও ইতিহাস-গবেষক ইকবাল চাঁদ মালহোত্রা। প্রতিরক্ষাবিষয়ক ওয়েবসাইট গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প (জিডিসি) ২ নভেম্বর এক প্রতিবেদনে তাঁর বরাতে দাবিটি প্রকাশ করে।

তবে প্রতিবেদনটিতে মালহোত্রার কোনো সরাসরি উদ্ধৃতি নেই। তিনি কথাটি কোথায় বলেছেন, বইয়ে, সাক্ষাৎকারে নাকি কোনো অনুষ্ঠানে, তা-ও জানানো হয়নি। দাবির পক্ষে কোনো নথিও প্রকাশ করা হয়নি। বারিন্দ পোস্ট স্বাধীনভাবে দাবিটি যাচাই করতে পারেনি।

প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

জিডিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালহোত্রা এই কথিত সম্পর্কের সঙ্গে ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার যোগসূত্র টেনেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) কাছে ‘শেখ মুজিবুর রহমান এজেন্ট মুজিব’ নামে একটি অভ্যন্তরীণ ফাইল ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ‘অপারেশন মুজিব’ নামে একটি কথিত গোপন ভারতীয় গোয়েন্দা নথির কথাও প্রতিবেদনে আছে, তবে সেই নথির কোনো অংশ উদ্ধৃত করা হয়নি।

সংস্থার নাম নিয়েও প্রতিবেদনে অসংগতি আছে। শিরোনামে বলা হয়েছে মুজিবকে ‘র’ রিক্রুট করেছিল, কিন্তু মূল লেখায় বলা হয়েছে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর কথা। ‘র’ গঠিত হয় ১৯৬৮ সালে। তার আগে বিদেশে গোয়েন্দা তৎপরতার দায়িত্বও ছিল আইবির হাতে। ফলে ১৯৬১ সালে ‘র’-এর পক্ষে কাউকে রিক্রুট করার সুযোগ ছিল না।

প্রতিবেদনটিতে জীবিত ব্যক্তিদের নিয়েও কিছু অভিযোগ আছে, যার পক্ষে কোনো সূত্র দেওয়া হয়নি। যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হলো না।

কে এই ইকবাল চাঁদ মালহোত্রা

মালহোত্রা ভারতের একজন টেলিভিশন প্রযোজক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। তাঁর বইয়ের পরিচিতিতে ছয়টি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কথা উল্লেখ আছে। ভারতের ওপেন ম্যাগাজিন ও দ্য প্রিন্টে তিনি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি নিয়ে লেখেন। চীন নিয়ে লেখা ‘রেড ফিয়ার: দ্য চায়না থ্রেট’ তাঁর একটি বই।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় সুব্রত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে লেখা তাঁর বই ‘বাংলাদেশ: হিউমিলিয়েশন, কার্নেজ, লিবারেশন, কেওস’ (প্রকাশক ব্লুওয়ান ইংক, ৩৬৮ পৃষ্ঠা)। ভারতের দ্য ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় মোহন গুরুস্বামী লিখেছেন, বইটি র‍্যাডক্লিফের দেশভাগরেখা থেকে আইয়ুব খানের শাসনামল, বাঙালির রাজনৈতিক জীবন দমন, বাংলায় বামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ এবং নিক্সন-ইয়াহিয়া সম্পর্কের কাহিনি বলেছে। ১৯৬১ সালে রিক্রুটের দাবিটি এই বইয়ে আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বইটির যে অংশ ওপেন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে অবশ্য ভিন্ন একটি সালের উল্লেখ আছে। সেখানে ‘র’-এর যুগ্ম সচিব পি এন ব্যানার্জিকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘১৯৬৫ সাল থেকে মুজিবের কেস অফিসার’ হিসেবে।

স্মৃতিকথা ও নথিতে যা আছে

মুজিবের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের সবচেয়ে পরিচিত প্রত্যক্ষ বিবরণ দিয়েছেন ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি। তিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্লগে তিনি লেখেন, ১৯৬২ সালের ২৪-২৫ ডিসেম্বর রাতে মুজিবের নিজের অনুরোধে তাঁদের প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক হয়। মুজিবের সঙ্গে ছিলেন ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ব্যানার্জির ভাষ্যে, এটিই ছিল কোনো ভারতীয় কর্মকর্তার সঙ্গে মুজিবের প্রথম বৈঠক।

ব্যানার্জি লিখেছেন, ওই বৈঠকে মুজিব বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের পূর্ণ সমর্থন চান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে লেখা ১৯৬২ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারিখের একটি ব্যক্তিগত চিঠিও তিনি ব্যানার্জির হাতে দেন। ভারত রাজি না হলে বিকল্প কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে মুজিব বলেন, তাঁর কোনো বিকল্প পরিকল্পনা নেই। ব্যানার্জির বিবরণ অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ আলোচনার পর নেহরু সমর্থনে রাজি হন, তবে এ নিয়ে কাগজে-কলমে কিছু লেখা হয়নি। নেহরুর বার্তা ছিল, আন্দোলনটি হতে হবে ধর্মনিরপেক্ষতাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী, বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক, আর অহিংসা হবে এর ঘোষিত নীতি। এটি ব্যানার্জির ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ।

মালহোত্রার দাবির সঙ্গে এই বিবরণের সময়ের পার্থক্য উল্লেখযোগ্য। ব্যানার্জির ভাষ্য ঠিক হলে ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরের আগে কোনো ভারতীয় কর্মকর্তার সঙ্গে মুজিবের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি।

মালহোত্রার বইয়ে যাঁকে মুজিবের ‘কেস অফিসার’ বলা হয়েছে, সেই পি এন ব্যানার্জির (ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি) পটভূমিও প্রাসঙ্গিক। তিনি ১৯৫৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আইবিতে প্রেষণে যোগ দেন এবং পরে আইবির যুগ্ম পরিচালক (পূর্বাঞ্চল) হন। ১৯৬৮ সালে ‘র’ গঠিত হলে তিনি সেখানে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ আছে।

আগরতলা মামলা ও ‘ভারতের চর’ অভিযোগ

মুজিবকে ভারতের সহযোগী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা নতুন নয়। পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ মামলা করে, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। অভিযোগ ছিল, ভারতের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং এর একটি অংশ হয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায়। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি মুজিবকে এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। আসামি ছিলেন মোট ৩৫ জন। ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয় ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন।

বিচার চলার মধ্যে ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বন্দী অবস্থায় আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করা হয়। গণ-আন্দোলনের চাপে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং পরদিন আসামিরা মুক্তি পান। রেসকোর্স ময়দানের সংবর্ধনায় মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়।

মামলার অন্যতম আসামি শওকত আলী পরে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার থাকাকালে সংসদে বলেছিলেন, অভিযোগগুলো সঠিক ছিল। তাঁর ভাষ্যে, পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে মুজিবের নেতৃত্বে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ ইয়ান ট্যালবটের মতে, আগরতলার যোগাযোগগুলো মুজিব ও ভারতের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের কোনো শক্ত প্রমাণ দেয়নি।

ভারতের দ্য ফেডারেলে প্রকাশিত এক ইতিহাসভিত্তিক লেখায় বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারেও ডানপন্থী প্রতিপক্ষরা মুজিবকে ‘ভারতের চর’ ও ‘ইসলামের শত্রু’ বলে প্রচার চালিয়েছিল। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ জয় পায়।

প্রতিক্রিয়া মেলেনি

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মালহোত্রার দাবি নিয়ে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ সরকার বা ভারত সরকারের কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। দাবির পক্ষে মালহোত্রার বিস্তারিত বক্তব্য বা কোনো নথিও এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।