রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সাঁওতাল গ্রাম আমতলীপাড়ার ছেলে রাফায়েল টুডু এখন দেশের ফুটবলে আলোচিত নাম। কুয়েতে চলমান এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে টানা দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে গোল করেছেন ফর্টিস এফসির এই ফরোয়ার্ড। তাঁর গোলেই শুরু হয়েছিল সেই প্রত্যাবর্তন, যার শেষে প্রথম বাংলাদেশি ক্লাব হিসেবে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে ম্যাচ জিতেছে ফর্টিস।
কুয়েতে টানা দুই ম্যাচে গোল
২০ অক্টোবর কুয়েতের মোহাম্মদ আল-হামাদ স্টেডিয়ামে ভারতের এফসি গোয়ার বিপক্ষে ৭৮ মিনিটে সমতাসূচক গোল করেন রাফায়েল। তবে শেষ দিকে আরেক গোল খেয়ে ২-১ ব্যবধানে হারে ফর্টিস। এর আগে প্রথম ম্যাচে কুয়েতের কাদসিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরেছিল দলটি।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) গ্রুপের শেষ ম্যাচে তাজিকিস্তানের এফসি রেগার-তাদাজের বিপক্ষে ১২ মিনিটেই পিছিয়ে পড়ে ফর্টিস। ৬৭ মিনিটে দূরের পোস্টে ওমরের বাড়ানো বল ব্যাকহিলে জালে পাঠিয়ে দলকে সমতায় ফেরান রাফায়েল। এরপর আরও দুই গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জিতে আসর শেষ করে ফর্টিস। দলটি অবশ্য আগেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিশ্চিত করেছিল।
রাফায়েল বলেছেন, নিজের গোলের চেয়ে দলের প্রথম জয়টাই তাঁর কাছে বেশি আনন্দের। তাঁর ভাষায়, প্রথমবারের মতো এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে এসে দল “প্রথম জয় তুলে নিয়েছে”—“সত্যিই খুব ভালো লাগছে।” স্বাভাবিকভাবে ‘নাম্বার নাইন’ বা সেন্টার ফরোয়ার্ড হলেও ফর্টিসের হয়ে উইংয়ে খেলেই গোল পেয়েছেন তিনি। কোচ যতটুকু সুযোগ দেন, তা কাজে লাগানোর মানসিকতাই তাঁর আত্মবিশ্বাসের উৎস বলে জানিয়েছেন।
গত মৌসুমে ঢাকা মোহামেডানে খেলেছেন রাফায়েল। মোহামেডানে থাকতেই তিনি লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন—“এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে বিদেশের মাটিতে খেলবো, প্রথম ম্যাচ জিতবো।” সেই লক্ষ্যেই এ মৌসুমে ফর্টিসে যোগ দেন তিনি।
আমতলীপাড়ার মাটির ঘর থেকে
গোদাগাড়ীর আমতলীপাড়ার বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। বাবা মানিক টুডু ছিলেন কৃষক; আট সদস্যের পরিবারে চার ভাই ও দুই বোন নিয়ে অভাবের সংসার। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরেই ফুটবলে হাতেখড়ি। ২০১৭ সালে বাবা যখন মারা যান, রাফায়েল তখন অনুশীলনে ছিলেন, বাড়িতে থাকতে পারেননি—সেই আক্ষেপ আজও তাঁকে পোড়ায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মা মাকলু হেমব্রম এখনো থাকেন মাটির ঘরে।
২০১৯ সালে রাজশাহীর কিশোর ফুটবল একাডেমিতে যোগ দেন রাফায়েল, কোচ মামুনুল ইসলাম তাঁকে প্রথমে গোলরক্ষক হিসেবেই গড়ে তোলেন। একই বছর মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে ট্রেনে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি—প্রথম আলো ও ইত্তেফাক দুই পত্রিকাতেই এ তথ্য রয়েছে। ২০২০-২১ মৌসুমে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে (বিসিএল) ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিংয়ের গোলরক্ষক হিসেবে দলে ছিলেন।
গ্লাভস ছেড়ে গোলের নেশা
গোলপোস্টের নিচে মন বসেনি রাফায়েলের। রাজশাহীতে ফিরে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা শুরু করেন। তিনি বলেছিলেন, “মেসিকে দেখেই গোলরক্ষক থেকে আমি স্ট্রাইকার হয়েছি।”
সিদ্ধান্তটা যে ঠিক ছিল, তা প্রমাণ হয় ২০২৩-২৪ মৌসুমের বিসিএলে। ফকিরেরপুল ইয়াংমেনসের প্রথম পাঁচ ম্যাচে মাঠেই নামা হয়নি তাঁর। কোচ ইমতিয়াজ খান লাবু সুযোগ দেওয়ার পর উত্তরা এফসির বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই করেন চার গোল। মৌসুম শেষে ৯ ম্যাচে ১২ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় হন তিনি; ফকিরেরপুল চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠে আসে শীর্ষ লিগে।
মাঠের বাইরেও থেমে থাকেননি। ২০২১ সালে এইচএসসি পাস করে ক্রীড়া কোটায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ইস্পাহানি-প্রথম আলো আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ৫ ম্যাচে ৮ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় হন তিনি; দল হয় রানার্সআপ। খেলোয়াড় কোটায় যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতেও।
লক্ষ্য জাতীয় দলের ‘নাম্বার নাইন’
দেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরেই ভালো স্থানীয় স্ট্রাইকারের অভাবের কথা বলা হয়। সেই শূন্যতা পূরণের স্বপ্ন দেখেন রাফায়েল। গত ডিসেম্বরে বলেছিলেন, “জাতীয় দলে খেলার সুযোগের অপেক্ষায় আছি।” কুয়েতে টানা দুই গোলের পর জানিয়েছেন, “জাতীয় দলে খেলাও আমার স্বপ্ন।” এ জন্য দেশের মাঠে নিয়মিত খেলার সুযোগ চান তিনি।
গোদাগাড়ীর সাঁওতাল পাড়া থেকে উঠে আসা এই তরুণ এখন বরেন্দ্র অঞ্চলের ফুটবলপ্রেমীদের গর্ব। গোলরক্ষক থেকে স্ট্রাইকার, বিসিএলের সর্বোচ্চ গোলদাতা থেকে এশিয়ার ক্লাব প্রতিযোগিতায় গোল—রাফায়েল টুডুর পথচলা বলে দেয়, সুযোগ পেলে প্রান্তিক জনপদ থেকেও উঠে আসতে পারে দেশের পরের ‘নাম্বার নাইন’।