বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

জিপিএ-৫ পেয়েছে বন্ধু, বিশ্বাস হয়নি আরেক বন্ধুর, গোপনে পুনঃনিরীক্ষণের পর রেজাল্ট আসল ‘ফেল’

এসএসসির খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের এই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং খাতা না দেখা পরীক্ষকদের আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন।

এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল এক শিক্ষার্থী। কিন্তু তার এক বন্ধুর তা বিশ্বাস হয়নি। বন্ধুর ধারণা ছিল, এত ভালো ফল পাওয়ার মতো পড়াশোনা ওই শিক্ষার্থীর নেই। সন্দেহ যাচাই করতে বন্ধুটি গোপনে, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর পরিচয় ব্যবহার করে তার খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করে। পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, জিপিএ-৫ পাওয়া সেই শিক্ষার্থী আসলে পাসই করেনি, ফেল করেছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) গাজীপুরে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই ঘটনার কথা জানান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানান, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে নম্বর বদলের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে।

যাচাই কোড ছাড়াই আবেদন

শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে কোনো যাচাই কোড (ভেরিফিকেশন কোড) লাগে না। সে কারণেই একজন শিক্ষার্থী আরেকজনের পরিচয়ে আবেদন করতে পেরেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী জানতই না যে তার খাতা নতুন করে যাচাইয়ের জন্য বোর্ডে গেছে। পুনঃনিরীক্ষণ শেষে তার নম্বর বদলে যায় এবং ফল দাঁড়ায় ‘অকৃতকার্য’।

কোন শিক্ষা বোর্ড, কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই ঘটনা, তা মন্ত্রী প্রকাশ করেননি। কোন বিষয়ে কত নম্বর কমেছে, সে বিবরণও দেওয়া হয়নি। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

‘শূন্য থেকে ৮৫, ১৩ থেকে ৮৩’

খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের আরও উদাহরণ তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, পুনঃনিরীক্ষণে দেখা গেছে কোনো খাতায় শূন্য নম্বরকে ৮৫ করা হয়েছে, কোথাও ১৩ নম্বর হয়ে গেছে ৮৩, আর জিপিএ দাঁড়িয়েছে এ প্লাস। এটা কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, পরিষ্কার যে কোথাও গোলমাল আছে। তাঁর ভাষায়, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’।

মন্ত্রীর অভিযোগ, কিছু পরীক্ষক খাতা নিজে না দেখে অন্যকে দিয়ে দেখিয়েছেন। যারা এভাবে দায়িত্বে গাফিলতি করেছেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি ঘোষণা দেন। তিনি স্বীকার করেন, কারা দায়ী তা খুঁজে বের করা কঠিন হবে, তবে অসম্ভব নয়।

পরীক্ষক বদল ও প্রশিক্ষণ

ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকাতে পরীক্ষক বদলানো হবে এবং পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। খাতা মূল্যায়নের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনার কথা বলেন তিনি।

এবারের এসএসসির সার্বিক চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ বছর প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়, পাস করে প্রায় ১২ লাখ। পুনঃনিরীক্ষণের জন্য প্রায় ১৩ লাখ খাতার আবেদন জমা পড়ে। তাঁর হিসাবে, যাচাইয়ের পর প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর জিপিএ বদলে যায়। এর মধ্যে ফেল থেকে পাস করে প্রায় ৫ হাজার জন, আর নতুন করে জিপিএ-৫ পায় ৩ হাজার ৭৯ জন।

পুনঃনিরীক্ষণে কী দেখা হয়

শিক্ষা বোর্ডগুলোর নিয়ম অনুযায়ী পুনঃনিরীক্ষণে খাতা নতুন করে মূল্যায়ন করা হয় না। পরীক্ষক সব উত্তরে নম্বর দিয়েছেন কি না, নম্বর যোগে ভুল আছে কি না এবং প্রাপ্ত নম্বর ঠিকভাবে ওএমআর শিটে তোলা হয়েছে কি না, কেবল এই বিষয়গুলো যাচাই করা হয়। সে কারণে সাধারণত পুনঃনিরীক্ষণে ফলের বড় পরিবর্তন হয় না। জিপিএ-৫ থেকে সরাসরি ফেল হওয়ার ঘটনা তাই প্রশ্ন তুলেছে, প্রথম দফায় খাতায় নম্বর কীভাবে বসেছিল।

বোর্ডের হিসাবে ফল বদলেছে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের

এ বছরের এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশিত হয় ১০ আগস্ট। এরপর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত চলে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করে। খাতার সংখ্যা ছিল লিখিত ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি। মূল ফল প্রকাশের ৩১ দিন পর, ১০ সেপ্টেম্বর, সব বোর্ড একযোগে পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ করে।

বোর্ডগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পুনঃনিরীক্ষণে ২৭ হাজার ৮৩৬ জনের জিপিএ বা গ্রেড বদলায়। নতুন করে জিপিএ-৫ পায় ৩ হাজার ৭৯ জন এবং ফেল থেকে পাস করে ৪ হাজার ৫৮৫ জন। মন্ত্রীর দেওয়া ৪৫ হাজারের হিসাবের সঙ্গে বোর্ডের এই সংখ্যার ফারাক রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে ঢাকা বোর্ডে, ৯৪ হাজার ২৩৬ জনের। রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বোর্ডে আবেদন করে ৩৯ হাজারের বেশি করে পরীক্ষার্থী, দিনাজপুর বোর্ডে ৩৭ হাজারের বেশি।

অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন

বাউবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। মূল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে নয়জন শিক্ষার্থীকে ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। মন্ত্রী তাদের হাতে সনদ ও ক্রেস্ট তুলে দেন।