বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রাজশাহী কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ ও নম্বর প্লেটের কাজে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের ভাষ্য, কর্মচারী, নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্য ও বহিরাগত দালালদের যোগসাজশে বাড়তি টাকা না দিলে কোনো কাজই এগোয় না।
সরেজমিনে দেখা যায়, বায়োমেট্রিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষায় থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী একটি শোরুমের মাধ্যমে ১২ হাজার টাকা দিয়েছেন। পাশেই বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদমান নামে এক শিক্ষার্থী জানান, গতবার সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েও তিনি ফেল করেছিলেন, কারণ কারও সঙ্গে "যোগাযোগ" করেননি। এবারও একই আশঙ্কা নিয়ে পরীক্ষায় বসেছিলেন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন বলে জানা গেছে।
লাইসেন্স রিনিউ ও ক্লাস উন্নয়নে এসেছিলেন কাটাখালীর একটি মাদরাসার এক শিক্ষক। তিনি জানান, পাস নিশ্চিত করতে প্রায় চার হাজার টাকা খরচ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ভারী লাইসেন্স ও রিনিউয়ের সময় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা বাড়তি দিতে হয়। রাজশাহী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) এক প্রশিক্ষক বলেন, "টাকা না দিলে ফেল করিয়ে দেবে, কী করবেন?" টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া একাধিক প্রার্থী জানান, দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও ফেল এড়াতে তাঁরা মাথাপিছু তিন হাজার টাকা করে দিয়েছেন।
সেবাগ্রহীতা ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, কার ও মোটরসাইকেলের যৌথ লাইসেন্সে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, প্রিলিমিনারি ও ভাইবায় পাস নিশ্চিত করতে তিন হাজার টাকা এবং পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি লাইসেন্সের জন্য সাত হাজার টাকা চাওয়া হয়। ফিটনেস ও বায়োমেট্রিক অনুমোদনে গাড়ি ও ব্যক্তিভেদে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ঘুসের টাকা বিভিন্ন টেবিলে ভাগ হয়, এমন দাবিও করেছেন ওই কর্মকর্তা।
লাইসেন্স প্রার্থী হিসেবে গিয়ে খোঁজ নিলে একজন অফিস সহকারী "কাজ করে দেওয়া যাবে" বলে জানান; কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে তিনি পরে দেখা যাবে বলে এড়িয়ে যান। এক আনসার সদস্য বলেন, তাঁদের সঙ্গে কাউকে কথা বলতে দেখলেই মানুষ মনে করে ঘুস নেওয়া হচ্ছে।
"সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫"-এর তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হওয়া খানার হার ৭৯.৩ শতাংশ; ঘুসের শিকার হয়েছে ৬৩.৫ শতাংশ খানা।
অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিএ রাজশাহী সার্কেলের সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান হক বলেন, এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ এখনো তাঁদের কাছে আসেনি। অধিকাংশ সেবা অনলাইনভিত্তিক হওয়ায় ফাইল নিয়ে অফিসে ঘোরার প্রয়োজন নেই। রিনিউয়ে বাড়তি টাকা চাওয়ার অভিযোগকে তিনি "সম্পূর্ণ ভুয়া" বলেন, কারণ রিনিউ এখন অনলাইনে হয়। টাকা না দিলে ফেল করানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাতায় পাস থাকলে কেউ ফেল করাবে না; তবে ফেল করা কাউকে পাস করানোর সুযোগ থাকে এবং সেটা কেউ একেবারেই করে না, এমন নয়। তাঁর ভাষ্য, "১৯-২০ থাকতে পারে।"