বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি ও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্ব শান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় ভাষণ দেন। তিনি এই অধিবেশনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানান এবং বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মাদাম আন্নালেনা বেয়ারবককে তাঁর সক্ষম নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ভাষণের শুরুতে তিনি বাংলাদেশের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র, বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গকারীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সাথে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার বীরত্বপূর্ণ গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত সকলের প্রতি তিনি সশ্রদ্ধ সালাম জানান। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ এখন ফ্যাসিবাদমুক্ত। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।” জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়েন। তাঁরাও একই মঞ্চে দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, আজ তিনিও তাঁর দেশ ও জনগণের স্বার্থে এবং একটি শান্তিপূর্ণ বৈশ্বিক সমাজের আকাঙ্ক্ষায় এখানে দাঁড়িয়েছেন। তারেক রহমান বলেন, বিদ্যমান মানবসৃষ্ট সংঘাত অনেক দেশে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং মানবিক সংকট দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি গুরুতর চাপে রয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, যেকোনো সংঘাতের সমাধান সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “আমাদের আকাঙ্ক্ষা একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব, একটি মানবিক বৈশ্বিক সমাজ, যেখানে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা এবং মানবতা অস্ত্রের পরিবর্তে পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে।” বাংলাদেশ জাতিসংঘকে এমন একটি ঐকমত্যভিত্তিক বৈশ্বিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখে, যা একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে সামরিক ব্যয়ে উন্নয়ন বাজেট স্থানান্তরের প্রবণতা বিশ্ব শান্তির পথে একটি বাধা। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বৈশ্বিক মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগে বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের উদ্বেগের কথা জানান। বাংলাদেশ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ সকল বৈধ দাবির প্রতি অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সকলের জন্য একটি জাতিসংঘ’—অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশ অবিচল। ‘শান্তি বিনির্মাণ কমিশন’-এর ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি বিনির্মাণে একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশ হিসেবে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবিক সেবায় নিয়োজিত। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ এজেন্ডা এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। এই বছর বাংলাদেশ ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণে শক্তিশালী বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রায় নয় বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এটি বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। জনবহুল বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও মূল কারণ মিয়ানমারে নিহিত; তাই এর সমাধানও সেখানেই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারে তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। বাংলাদেশ এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে জোরালো ও কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে এবং তাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানায়।