প্রতীকীভাবে ধরা যায়—একটি অন্ধকার, গোপন আটককক্ষ, যা ‘সিক্রেট মিরর হাউস’ নামে পরিচিত, লক করা লোহা দ্বার দিয়ে অদৃশ্যতার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ন্যায়ের হাতুড়ি এবং আইনের ভারসাম্য, স্পটলাইটে আলোকিত, যেন নির্দেশ করছে—নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার ও মানবাধিকার রক্ষার আলো পৌঁছাচ্ছে সর্বত্র। মাটিতে ছড়ানো ভাঙা চেইন প্রমাণ দিচ্ছে—গোপন অপহরণের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা হচ্ছে, এবং শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরে আসছে। পেছনের ব্যানারে হালকা আলোর নিচে লেখা আছে—‘Anti-Enforced Disappearance Ordinance 2025’, যা আইন প্রণয়নের গুরুত্বকে প্রতিফলিত করছে।
সরকারের প্রস্তাবিত খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য যদি নিজের পরিচয় বা কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কাউকে গুম করেন, তাহলে এ অপরাধের জন্য জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। যদি গুমের ফলে মৃত্যু ঘটে বা গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করা না যায়, তাহলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করা হবে।
এছাড়া, গুমের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিনষ্ট, গোপন বা বিকৃত করা হলে ৭ বছরের জেল এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ ও ব্যবহারও একইভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধের মধ্যে পড়বে।
অধ্যাদেশে নির্ধারিত হয়েছে, মানবাধিকার কমিশনই গুমসংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এ ঘটনার তদন্ত করতে পারবে না। দেশের জেলা ও বিভাগীয় শহরে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে, এবং অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচারের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তি, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সহায়তার জন্য স্বতন্ত্র তহবিল গঠন করা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে যতক্ষণ না ওই ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি প্রকাশিত হয়।
এ অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়নের পেছনে আন্তর্জাতিক প্রভাবও রয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত United Nations Convention Against Enforced Disappearance 2024-এর অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ ২৯ আগস্ট ২০২৪-এ এতে যোগ দিয়েছে। সংবিধানে সংরক্ষিত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করতে এই অধ্যাদেশটি প্রণীত হচ্ছে।
প্রতীকী চিত্র এবং বাস্তব আইন উভয়ই নির্দেশ করছে—গোপন আটককেন্দ্রের অন্ধকারকে নির্মূল করতে এবং মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের রক্ষা করতে দেশের আইনসভা এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপন হচ্ছে।