বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে ১০০ নিহত

শুধু গাজা সিটিতেই প্রাণ হারালেন ৬১ জন

গাজা
ছবি: গাজা

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলায় বুধবার ভোর থেকে অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে গাজা সিটিতেই নিহত হয়েছেন ৬১ জন। খাদ্য ও সহায়তা নিতে গিয়ে আরও অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন। শিশুদের ওপর হামলা, অনাহার ও স্বাস্থ্যসেবার ধ্বংসযজ্ঞকে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা গণহত্যা ও ‘মেডিসাইড’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের তীব্র বোমাবর্ষণ বুধবার নতুন করে রক্তাক্ত করেছে অঞ্চলটিকে। চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, ভোর থেকে শুরু হওয়া হামলায় অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজা সিটির ভেতরেই প্রাণ হারিয়েছেন ৬১ জন। আল জাজিরার মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় হামলা আরও জোরদার হয়েছে।

উত্তর গাজা সিটির কাছে সাহায্য বিতরণের চেষ্টা করছিলেন এমন একটি দলের ওপর বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হন। নাসের হাসপাতাল জানিয়েছে, রাফাহর উত্তরে খাদ্যের সন্ধানে থাকা অন্তত ১৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। গাজার জরুরি ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা বিভাগ জানিয়েছে, উত্তরে সাহায্য কেন্দ্রের কাছে অপেক্ষমাণ অবস্থায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ১৪ জন নিহত ও ১১৩ জন আহত হন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অনাহার ও অপুষ্টিজনিত কারণে আরও ৮ জন মারা গেছেন, যার মধ্যে তিন শিশু রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৫-এ, যার মধ্যে ১০৬ জন শিশু।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ)-এর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেছেন, “এটি গাজার শিশুদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত।” তিনি উল্লেখ করেন, ৪০ হাজারের বেশি শিশু বোমা ও হামলায় নিহত বা আহত হয়েছে, অন্তত ১৭ হাজার শিশু পিতামাতা বা অভিভাবকহীন, এবং এক মিলিয়ন শিশু শিক্ষাবঞ্চিত ও গভীর মানসিক আঘাতে ভুগছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ইসরায়েলকে স্বাস্থ্যখাত ধ্বংসের মাধ্যমে ‘মেডিসাইড’ করার অভিযোগ এনেছেন। তারা বলেন, এটি ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে তৈরি পরিস্থিতির অংশ, যা গণহত্যার সমতুল্য।

যুদ্ধবিরতি আলোচনায় নতুন উদ্যোগ

ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর মাঝেই বুধবার মিসরে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে একটি হামাস প্রতিনিধি দল পৌঁছেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে কাতারে হওয়া আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। হামাস জানিয়েছে, তারা যুদ্ধ শেষ করতে আলোচনায় প্রস্তুত এবং গাজার প্রশাসন একটি নিরপেক্ষ কমিটির হাতে তুলে দিতে রাজি, তবে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে অস্ত্র সমর্পণ করবে না।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, হামাসকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।

গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা ও ধ্বংসযজ্ঞ

গাজা সিটির অন্যতম বড় এলাকা জেইতুনে গত তিন দিনে ৩০০-রও বেশি বাড়ি ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বোমা দিয়ে পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে, চারপাশের ভবনও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা সিটি দখল এবং শত-সহস্র ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক ‘কনসেন্ট্রেশন জোন’-এ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার জন্ম দিয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনীর প্রধান আইয়াল জামির বুধবার বলেন, সেনাদের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ বাড়িয়ে আসন্ন অভিযানের জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি

আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ জানান, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে, বিশেষত জেইতুন ও সাবরা এলাকায় গভীর রাতে ব্যাপক বিস্ফোরণ শোনা গেছে। রাতে ভারী আর্টিলারি ও বিমান হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন। শেখ রাদওয়ান এলাকায় বাড়ি ছেড়ে পালানোর সময় আরও তিনজন নিহত হন।

উত্তর গাজার জিকিম ক্রসিং, যা একমাত্র সাহায্যের প্রবেশপথ, এখন ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘মৃত্যুকেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে। সীমিত সংখ্যক ট্রাক ঢুকতে দেওয়া হলেও সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের গুলি বা ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

মাহমুদ বলেন, “আন্তর্জাতিক নিন্দা বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন নেই। কিছু সাহায্যের ট্রাক ঢোকানো হচ্ছে মিডিয়ায় দেখানোর জন্য, অথচ প্রতিদিন অনাহারে মানুষ মরছে।”