ঝকঝকে নীল আকাশে সূর্য জ্বলছে, অথচ এক কোণে ফ্যাকাশে চাঁদ ঝুলে আছে—দৃশ্যটা অনেকের কাছেই একটু অদ্ভুত লাগে। চাঁদ কি তবে রাতের নিয়ম ভাঙছে? মোটেই না। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ব্যাখ্যা বলছে, চাঁদ রাতের আকাশে যতটা সময় থাকে, দিনের আকাশেও প্রায় ততটাই থাকে। শুধু দিনের আলোয় তাকে খুঁজে নিতে একটু বেশি মনোযোগ লাগে।
চাঁদ আলো পায় কোথা থেকে
চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই। আমরা যে জোছনা দেখি, তা আসলে সূর্যের আলো, যা চাঁদের গায়ে পড়ে পৃথিবীর দিকে প্রতিফলিত হয়। দিনের বেলাতেও এই প্রতিফলিত আলো যথেষ্ট উজ্জ্বল, তাই আকাশের সঠিক অংশে থাকলে নীল আকাশের পটেও চাঁদ দেখা যায়।
তারারাও কিন্তু দিনের বেলা আকাশে থাকে। নাসার বিজ্ঞানী সারাহ নোবেলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দিনের আকাশ এত উজ্জ্বল যে দূরের তারাগুলোর আলো তাতে হারিয়ে যায়। চাঁদ অনেক কাছে এবং অনেক উজ্জ্বল বলেই সে এই প্রতিযোগিতায় টিকে যায়।
কখন দেখা যাবে, তা ঠিক করে চাঁদের কলা
সূর্য সব সময় চাঁদের অর্ধেক অংশ আলোকিত রাখে। পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরার সময় সেই আলোকিত অংশের কতটা আমাদের দিকে ফেরানো থাকে, তা বদলায়—এটাই চাঁদের কলা বা দশা। পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে চাঁদের লাগে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ দিন, আর এক অমাবস্যা থেকে পরের অমাবস্যা পর্যন্ত পুরো চক্র ঘুরে আসতে লাগে প্রায় সাড়ে ২৯ দিন। প্রতিদিন চাঁদ আগের দিনের চেয়ে মোটামুটি ৫০ মিনিট দেরিতে অস্ত যায়, তাই মাসজুড়ে তার দেখা মেলার সময়ও সরে সরে যায়।
নাসার দেওয়া আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী—
- অমাবস্যা: সূর্যের সঙ্গেই ওঠে, সূর্যের সঙ্গেই অস্ত যায়। দিনে আকাশে থাকলেও আলোকিত দিকটা পৃথিবীর উল্টো দিকে থাকে বলে দেখা যায় না। দিনের বেলা চাঁদ দেখা যায় না কেবল এই দশাতেই।
- শুক্লপক্ষের বাঁকা চাঁদ: সূর্যোদয়ের পর সকালে ওঠে, সূর্যাস্তের পর রাতে অস্ত যায়—তাই দিনের আকাশে প্রায়ই চোখে পড়ে।
- প্রথম চতুর্থাংশ (আধখানা চাঁদ): দুপুরের দিকে ওঠে, মাঝরাতের দিকে অস্ত যায়। বিকেলের আকাশে চাঁদ খোঁজার সবচেয়ে ভালো সময়।
- বাড়ন্ত কুঁজো চাঁদ: সূর্যাস্তের আগেই বিকেলে ওঠে, ভোরের আগে অস্ত যায়।
- পূর্ণিমা: সূর্যের ঠিক উল্টো দিকে থাকে; সূর্য যখন অস্ত যায় তখন ওঠে, সূর্যোদয়ের দিকে অস্ত যায়। তাই পূর্ণিমার চাঁদ মূলত রাতেরই।
- ক্ষয়িষ্ণু কুঁজো চাঁদ: সূর্যাস্তের পর রাতে ওঠে, সূর্যোদয়ের পর সকালে অস্ত যায়।
- শেষ চতুর্থাংশ: মাঝরাতের দিকে ওঠে, দুপুরের দিকে অস্ত যায়—সকালের আকাশের সঙ্গী।
- কৃষ্ণপক্ষের বাঁকা চাঁদ: সূর্যোদয়ের আগে ভোরে ওঠে, সূর্যাস্তের আগে বিকেলে অস্ত যায়।
তবু কেন চোখ এড়িয়ে যায়
দিনের বেলা যে দশাগুলোতে চাঁদ বেশি থাকে, যেমন বাঁকা চাঁদ, তখন তার আলোকিত অংশের সামান্যই আমাদের দিকে থাকে। তার ওপর আকাশে সূর্য থাকায় চাঁদকে ফ্যাকাশে, প্রায় স্বচ্ছ দেখায়। তাই অনেকে খেয়ালই করেন না।
নাসা মনে করিয়ে দিয়েছে, ওঠা-ডোবার এই সময়গুলো আনুমানিক। কোন সময় চাঁদ দেখা যাবে, তা দশার পাশাপাশি বছরের সময় ও আপনি পৃথিবীর কোথায় আছেন, তার ওপরও নির্ভর করে। নির্দিষ্ট দিনের চন্দ্রোদয় ও চন্দ্রাস্তের সময় জানতে স্থানীয় পূর্বাভাস দেখাই ভালো।
অর্থাৎ দিনের আকাশে চাঁদ পথ ভুলে আসেনি, নিয়মও ভাঙছে না—কক্ষপথের জ্যামিতি ঠিক যেমন হওয়ার কথা, তেমনই চলছে। পরের বার বিকেলে মাথার ওপর আধখানা চাঁদ দেখলে বুঝবেন, সম্ভবত সেটা প্রথম চতুর্থাংশের চাঁদ।