দেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ তথ্য পেয়েছেন। জরিপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ৩০.২ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৫১.৯ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (মিকস) উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ ফল পেয়েছেন। ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় হওয়া এই জরিপে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে সিসাসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা নতুন করে রক্ত পরীক্ষা করেননি; আগে সংগ্রহ করা পরীক্ষার ফল ও পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য নিয়ে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণাপত্রটি চলতি মাসের ১৪ তারিখে মেডআর্কাইভে প্রকাশিত হয়েছে।
জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্তে সিসার পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা থাকলে সেটিকে উচ্চমাত্রা ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই বয়সী শিশুদের ৩৮.৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসা এই সীমায় বা তার ওপরে। পরিবারের সম্পদের স্তর যত ওপরে, উচ্চমাত্রার হারও তত বেশি। মায়ের শিক্ষা, ঘরের অবস্থা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এ সম্পর্ক বজায় ছিল।
বিভাগভেদেও বড় পার্থক্য আছে। মিকসের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ঢাকায় শিশুদের ৬৫.২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এ হার ৪৬.৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৪২.১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০.৬ শতাংশ ও বরিশালে ২৯ শতাংশ। রংপুরে ১৯.৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭.৮ শতাংশ এবং রাজশাহীতে সবচেয়ে কম, ১৫.৯ শতাংশ।
ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি কেন, জানতে চাইলে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন বলেন, ধনী পরিবারের শিশুরা প্যাকেটজাত খাবার বেশি খেতে পারে এবং তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও নানা তৈজস বেশি থাকে, এসব পণ্যে সিসা থাকতে পারে। তবে গবেষণায় এসব উৎস আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি, তাই সরাসরি কারণ নির্ধারণ করা যায় না। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা মনে করেন, সম্পন্ন পরিবারের শিশুরা আমদানি করা খেলনা ও সাজসজ্জার সামগ্রীর সংস্পর্শে বেশি আসে। পোলট্রির মুরগির খাবারে সিসা থাকতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়। সিসা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ক্ষতি করতে পারে; এর প্রভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, বাহ্যিক চেহারা দেখে সিসার ক্ষতি বোঝা যায় না এবং তুলনামূলক কম মাত্রার সংস্পর্শেও বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি ও অধ্যাপক সহিদুল্লা দুজনই জানান, আগের তুলনায় স্নায়ুগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু তাঁদের কাছে বেশি আসছে। ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর ডব্লিউএইচওর উদ্যোগে ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে।