বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

কাবার আদলে নির্মিত কবর ঘিরে তাণ্ডব, রাজবাড়ীতে লাশ দাহ

শাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ, আলেম সমাজের নিন্দা—অজ্ঞাত হাজারো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা

নুরাল পাগলা
ছবি: নুরাল পাগলা

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নিজেকে ইমাম মাহদী দাবিকারী নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার কবর ভেঙে উত্তেজিত জনতা তার লাশ উত্তোলন করে দাহ করেছে। শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের জোড়ান মোল্লাপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ, নিন্দা ও সামাজিক বিভাজন দেখা দিয়েছে।

কী ঘটেছিল

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদুর রহমান জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী জুমার পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে সমাবেশ হয়। বক্তারা কাবার আদলে কবর নির্মাণকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে আহ্বান জানান। সমাবেশ শেষে মিছিল দরবার শরীফমুখী হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধায় ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা দরবার প্রাঙ্গণে ঢুকে ভাঙচুর–অগ্নিসংযোগ করে; পরে ১২ ফুট উঁচু কবরটি ভেঙে লাশ উত্তোলন করে পদ্মার মোড়ে নিয়ে দাহ করা হয়। ঘটনাটি মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ–প্রশাসনের গাড়িও ভাঙচুর হয় এবং কয়েকজন আহত হন।

‘নুরাল পাগলা’ কে—পূর্বাপর প্রেক্ষাপট

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮০-এর দশকে নুরাল পাগলা নিজ বাড়িতে দরবার শরীফ গড়ে তোলেন। সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে ‘ইমাম মাহদী’ হিসেবে দাবি করেন এবং ভক্তদের মধ্যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মাহদী রাসূলুল্লাহ”—শিরোনামে একটি নতুন কালেমা প্রচলনের অভিযোগ ওঠে।
আরও অভিযোগ—

আজানে বাক্য পরিবর্তন করে “আশহাদু আনা ইমাম মাহদী রাসূলুল্লাহ” প্রচার,

কোরআনকে ‘ভোজপাতা’ বলে অবমাননা করা, কোরআন ছুড়ে ফেলা/পদদলিত করা,

অনুসারীদের কেউ নামাজ না পড়া, বা পূর্বদিকে মুখ করে নামাজ পড়ার প্রথা চালু করা,

দরুদ শরীফ বিকৃত করে তার নাম সন্নিবেশের প্রচলন।

এসব কারণে তিনি এলাকায় দীর্ঘদিন বিতর্কিত ছিলেন। অভিযোগগুলো স্থানীয় আলেম–মুসল্লি ও ভিডিও–সাবটাইটেলে উত্থাপিত; স্বাধীনভাবে এসবের বিচারিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্য নয়—এ তথ্যভিত্তিক সতর্কতা জানানো হলো।

মৃত্যু, কবর নির্মাণ ও নতুন করে উত্তেজনা

২৩ আগস্ট ২০২৫—বার্ধক্যজনিত কারণে নুরাল পাগলা মৃত্যুবরণ করেন। সেই রাতেই তাঁর ভক্তরা বিশেষ কায়দায় কবর নির্মাণ করেন—১২ ফুট উঁচু বেদির ওপর, কাবার আদলে সাজিয়ে, সামনে সাইনবোর্ডে লেখা—“ইমাম মাহদীর কবর”। এ ঘটনায় এলাকায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বলে অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় মুসল্লি–আলেম সমাজ ও নাগরিকরা ‘ঈমান–আকিদা রক্ষা কমিটি’ গঠন করে প্রেস কনফারেন্স ও প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন; জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন দিয়ে কবর সমতল করার দাবিও তোলা হয়। কার্যকর পদক্ষেপ না আসায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

‘খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা’ অভিযোগ—পুত্রকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

ভিডিওতে বলা হয়, দরবার খোলার পর সাধারণ মানুষকে ‘ঈসা নবীর উম্মত’ হওয়ার দীক্ষা দেওয়ার আড়ালে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার অভিযোগে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসেন নুরাল পাগলার ছেলে মেহেদী নূর (তারেজ)। এরপর তিনি ঢাকা থেকে ‘ঈসা (আ.)–এর ধর্মের’ নামে কার্যক্রম চালিয়ে বাবার নামে দরবার পরিচালনা ও অনুসারী সংগ্রহ করছিলেন বলে দাবি ওঠে। (এই অভিযোগগুলোও স্বাধীনভাবে যাচাই সাপেক্ষ।)

সমাবেশ, মুখোমুখি অবস্থা ও ধ্বংস–যজ্ঞ

শুক্রবারের সমাবেশে ইমাম কমিটি, জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা, বিএনপির প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের বক্তারা উপস্থিত ছিলেন—বক্তৃতায় কবরকে কাবার অনুকরণে নির্মাণকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলা হয় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে আহ্বান জানানো হয়। মিছিল দরবারে গেলে বাধা–বিঘ্ন, সংঘর্ষ, লাঠিসোঁটা–সাবল–হাতুড়ি নিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ—এরপর কবর খুঁড়ে লাশ উত্তোলন ও দাহ।

পুলিশের মামলা ও প্রশাসনের অবস্থান

গোয়ালন্দঘাট থানার ওসি রাকিবুল ইসলাম জানান, থানার উপপরিদর্শক সেলিম বাদী হয়ে ভোরে অজ্ঞাত হাজারো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন—অভিযোগ: পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি দায়িত্বে বাধা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ, লাইভ সম্প্রচার, সিসিটিভি বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্যগ্রহণ চলবে বলে জানান তিনি। (গ্রেপ্তার/রিমান্ড সংক্রান্ত তথ্য এই রিপোর্ট দাখিলের সময় পাওয়া যায়নি।)

আলেম সমাজ—প্রতিবাদ ও সংযম, দুদিকেই জোর

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব শায়েখ হারুন ইজহার বলেন, “শিরক–কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মুসলমানের অধিকার। তবে ত্রাস সৃষ্টি ও আইন লঙ্ঘন সমর্থনযোগ্য নয়; লাশ দাহ ইসলাম সমর্থন করে না। প্রতিবাদ হতে হবে প্রজ্ঞা ও দাওয়াতের ভাষায়।”
ইসলামী আলোচক মাওলানা আবু মোহাম্মদ রহমানি বলেন, “কাবার আদলে কবর নির্মাণে মুসলমানের হৃদয়ে আঘাত লেগেছে—এটা সত্য। কিন্তু কবর থেকে লাশ তুলে জ্বালিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই শরিয়তসম্মত নয়। প্রশাসনের গাফিলতি ক্ষোভকে বিস্ফোরণে রূপ দিয়েছে। মিডিয়ারও উচিত ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট তুলে ধরা।”

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও মেরুকরণ

ঘটনার পর জনমনে তীব্র দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া:

একপক্ষ নুরাল পাগলার আকীদা–বিরোধী কর্মকাণ্ডের কঠোর নিন্দা করছে;

অন্যপক্ষ লাশ দাহকে বর্বরোচিত আখ্যা দিয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়ার দাবি তুলছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সময়মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না আসায় উত্তেজনা দমন না হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ

ঘটনাস্থল ও আশপাশে পুলিশ মোতায়েন জোরদার করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে টহল বাড়িয়েছে। দরবার প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি তালিকা তৈরি এবং স্বাক্ষী–ভিডিও সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বিবেচনায় শান্তি–শৃঙ্খলা বজায় রাখার সামাজিক উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

টাইমলাইন

১৯৮০–এর দশক: নুরাল পাগলার দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা; আকীদা–বিরোধী নানা অভিযোগ।

২৩ আগস্ট ২০২৫: নুরাল পাগলার মৃত্যু (বার্ধক্যজনিত কারণ); রাতেই ১২ ফুট উঁচু কবর, কাবার আদলে সাজানো; বোর্ডে—“ইমাম মাহদীর কবর”।

২৩–৩১ আগস্ট: স্থানীয় মুসল্লি–আলেমদের প্রতিবাদ; ঈমান–আকীদা রক্ষা কমিটি গঠন; প্রেস কনফারেন্স ও জেলা প্রশাসকে আবেদন—কবর সমতল করার দাবি।

১–৪ সেপ্টেম্বর: প্রশাসনিক বৈঠক হলেও কার্যকর অগ্রগতি নেই—এ অভিযোগে উত্তেজনা চরমে।

৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার): জুমার পর সমাবেশ–মিছিল; বাধা–সংঘর্ষ; ভাঙচুর–অগ্নিসংযোগ; কবর ভাঙা–লাশ উত্তোলন; পদ্মার মোড়ে দাহ।

৬ সেপ্টেম্বর ভোর: অজ্ঞাত হাজারো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা; তদন্ত শুরু।

আইনি–নৈতিক নোট

রিপোর্টে উত্থাপিত ধর্মীয় বিকৃতি, দীক্ষা–রূপান্তর ইত্যাদি গুরুতর অভিযোগ—এগুলো ভিডিও/স্থানীয় সূত্রে বলা; বিচারিক যাচাই এখনো বাকি।

লাশ উত্তোলন ও দাহ—দণ্ডবিধি, কবর–সম্পর্কিত আইন এবং ধর্মীয় বিধান—সব দিক থেকেই অবৈধ/অগ্রহণযোগ্য—এমনই বলছেন আলেম–আইনজ্ঞরা; তবে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা আদালতের।

সংবাদটি সর্বজনীন সংবেদনশীলতা মাথায় রেখে অভিযোগ–উদ্ধৃতি–নিরপেক্ষ ভাষাতে লেখা হয়েছে।