মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬
নোবেল পুরস্কার ২০২৬

অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও সংকট মোকাবিলার মূল রূপকার: নোবেল পেলেন হ্যাল ও উডফোর্ড

মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত কীভাবে দেশের পুরো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে, তার তাত্ত্বিক সমাধান।

রবার্ট ই. হ্যাল এবং মাইকেল উডফোর্ড  - ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী
ছবি: রবার্ট ই. হ্যাল এবং মাইকেল উডফোর্ড - ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী

২০২৬ সালের ১২ই অক্টোবর, রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে। এ বছর যৌথভাবে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভ করেছেন দুই খ্যাতনামা মার্কিন অর্থনীতিবিদ—স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রবার্ট ই. হ্যাল (Robert E. Hall) এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মাইকেল উডফোর্ড (Michael Woodford)।

নোবেল কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, "সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি (microeconomic foundations of macroeconomic stabilisation) প্রবর্তনে অনন্য অবদানের জন্য" তাঁদের যৌথভাবে এই পুরস্কার প্রদান করা হলো। পুরস্কার বিজয়ী দুই গবেষক যৌথভাবে ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার) ভাগ করে নেবেন।

কেন এই নোবেল জয়: গবেষণার মূল বিষয়বস্তু ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

ঐতিহাসিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics—যেমন মুদ্রাস্ফীতি, জিডিপি বৃদ্ধি, বেকারত্ব) এবং ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics—যেমন ব্যক্তিমানুষের সঞ্চয়, প্রতিষ্ঠানের দাম নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ)-র মধ্যে এক ধরণের তাত্ত্বিক দূরত্ব ছিল। রবার্ট হ্যাল এবং মাইকেল উডফোর্ড এই দুই ক্ষেত্রকে এক সুতোয় বেঁধে আধুনিক অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটান।

১. রবার্ট ই. হ্যালের উদ্ভাবনী ভূমিকা (Random Walk & Consumption)

রবার্ট হ্যাল ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে প্রথম দেখান যে, মানুষের বর্তমান ব্যবহার ও সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত মূলত তাদের দীর্ঘমেয়াদী আয়ের প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে।

র্যান্ডম ওয়াক হাইপোথিসিস (Random Walk of Consumption): হ্যাল প্রমাণ করেন যে ভোক্তা বা সাধারণ মানুষের খরচের ধরন আগে থেকে সাধারণ উপায়ে পূর্বাভাস দেওয়া যায় না; বরং কেবল অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা বা সংবাদ আসলেই খরচের ধরন পরিবর্তিত হয়।

এটি প্রথাগত কেইনসীয় (Keynesian) অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং প্রমাণ করে যে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষকে চালিত করতে পারে না, বরং মানুষের প্রত্যাশা (Expectations) ও মনোভাবকে গুরুত্ব দিতে হয়।

২. মাইকেল উডফোর্ডের নিউ-কেইনসীয় বিপ্লব (New Keynesian Framework)

মাইকেল উডফোর্ড ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে হ্যালের তত্ত্বকে ভিত্তি করে আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মূল চালিকাশক্তি গড়ে তোলেন।

'ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস' (Interest and Prices): উডফোর্ডের ২০০৩ সালের এই বইটিকে আধুনিক আর্থিক নীতির "বাইবেল" বলা হয়। এতে তিনি দেখান যে পণ্য ও সেবার দাম তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তিত হয় না (Sticky Prices)। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে সুদের হার পরিবর্তন করে বাজারে অর্থের জোগান ও মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার গাণিতিক ভিত্তি তৈরি করেন তিনি।

ক্যাশলেস ইকোনমি ও মুদ্রানীতি: উডফোর্ড প্রমাণ করেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রা ছাপানোর ক্ষমতা না থাকলেও কেবল সুদের হারের দিকনির্দেশনা (Forward Guidance) দিয়ে বাজারের ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

কেন এই অবদানের গুরুত্ব আধুনিক অর্থনীতিতে অপরিসীম?

রবার্ট হ্যাল ও মাইকেল উডফোর্ডের যৌথ গবেষণা কেবল অ্যাকাডেমিক গবেষণার বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের সার্বিক গতিপথ বদলে দিয়েছে।

প্রয়োগের ক্ষেত্রবাস্তব জীবনের প্রভাব ও গুরুত্ব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নতুন রূপরেখাফেডারেল রিজার্ভ (US Fed), ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ECB) এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের মূল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বর্তমানে যে 'ইনফ্লেশন টার্গেটিং' বা সুদের হার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতি ব্যবহার করে, তা উডফোর্ড ও হ্যালের কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
অর্থনৈতিক মন্দা সামলানো২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট কিংবা পরবর্তী সময়ের মহামারি-উত্তর মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে রাষ্ট্রগুলো কীভাবে ঋণ ও প্রণোদনা প্যাকেজ সাজাবে, তা তাঁদের ব্যষ্টিক মডেল থেকে নির্ধারণ করা হয়।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণ (Forward Guidance)হ্যাল ও উডফোর্ড দেখিয়েছেন যে কেবল আজকের আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে কী করবে তার আগাম বার্তা দিলে বাজার স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

এক নজরে ২০২৬ অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার

বিষয়তথ্য
বিজয়ী অর্থনীতিবিদদ্বয়রবার্ট ই. হ্যাল (Robert E. Hall) ও মাইকেল উডফোর্ড (Michael Woodford)
জাতীয়তাআমেরিকান (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
কর্মস্থলস্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
পুরস্কারের কারণসামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ব্যষ্টিক বা ক্ষুদ্রভিত্তিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা
পুরস্কারের অর্থ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (যৌথভাবে বিভাজ্য)
প্রধান ক্ষেত্রম্যাক্রোইকোনমিক্স, মনিটারি পলিসি ও নিউ-কেইনসিয়ান ইকোনমিক্স

রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের মতে, আধুনিক বিশ্বের জটিল অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মন্দা ও চরম মূল্যস্ফীতির সময়ে উডফোর্ড এবং হ্যালের তৈরি অর্থনৈতিক মডেলসমূহ পৃথিবীর সমস্ত নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক নির্ভরযোগ্য কম্পাস হিসেবে কাজ করছে।