শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজকীয় ঐতিহ্য, রাজনীতি ও রহস্যের সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান রত্ন দরিয়া-ই-নূর। ফার্সি ভাষায় যার আক্ষরিক অর্থ “আলোর সমুদ্র”।
এটি একটি ২৬ ক্যারেট ওজনের টেবিল-কাট সাদা হীরা, দক্ষিণ ভারতের কোল্লুর হীরার খনি থেকে উত্তোলিত। মূল্য ও আকারের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং মূল্যবান রত্ন। ঐতিহাসিকভাবে একে অনেক সময় বিখ্যাত কোহিনূরের সহোদর বলা হয়।
নামকরণ ও বিভ্রান্তি
মধ্যযুগে শাসকেরা ঐশ্বর্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তাদের সংগ্রহে থাকা উৎকৃষ্ট হীরাগুলিকে প্রায়ই “দরিয়া-ই-নূর” বা “কোহিনূর” নাম দিতেন। ফলে ইতিহাসে একই নামে একাধিক হীরার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রায়ই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এর মধ্যে ইরানে সংরক্ষিত ১৮২ ক্যারেট ওজনের গোলাপী হীরাও “দারিয়া-এ নূর” নামে পরিচিত।
নবাবদের হাতে আসা
১৭৩৯ সালে নাদের শাহ মুঘলদের কাছ থেকে দখল করার পর হীরাটি দীর্ঘ সময় ধরে নানা মালিকানার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। শেষ পর্যন্ত ১৮৫২ সালে কলকাতায় এক নিলামে ঢাকার নবাব খাজা আলীমুল্লাহ প্রায় ৭৫,০০০ রুপিতে এটি ক্রয় করেন। এরপর এটি ঢাকার নবাব পরিবারের গৌরবের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং কখনো বাজুবন্দ, কখনো পাগড়ির অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু নবাব সলিমুল্লাহর সময় এস্টেট চরম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জনকল্যাণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিপুল ব্যয়ের ফলে তিনি ১৯০৮ সালে দরিয়া-ই-নূরসহ রাজপরিবারের রত্ন বন্ধক রেখে সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেন। ঋণ শোধ না হওয়ায় রত্নটি রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে চলে যায়।
ব্যাংকে সংরক্ষণ
ঔপনিবেশিক আমলে এবং স্বাধীনতার পর নানা সময় দরিয়া-ই-নূরকে কলকাতা, করাচি ও ঢাকার বিভিন্ন ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে এটি ঢাকার মতিঝিলের সোনালী ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষিত আছে বলে ধরা হয়।
তবে রহস্যও কম নয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্নবার পরিদর্শনের কথা উল্লেখ থাকলেও সেই প্রতিবেদনগুলো সংরক্ষিত নেই। ২০১১ সালে ব্যাংকের সিন্দুক খোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আসল হীরা দেখা হয়নি, শুধু সিলগালা বাক্স পরীক্ষা করা হয়। এ কারণে অনেকের মনে সন্দেহ জেগেছে—আসলে কি দরিয়া-ই-নূর এখনো ভল্টে আছে, নাকি হারিয়ে গেছে?
সরকারের নতুন উদ্যোগ
সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নবাব পরিবারের মোট ১০৯ প্রকার রত্নালংকারের প্যাকেট আনুষ্ঠানিকভাবে খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক, সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও একজন রত্নবিশেষজ্ঞকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিটি প্রথমে সিন্দুক খুলে সব রত্নের তালিকা প্রণয়ন করবে। এরপর নিরাপত্তার স্বার্থে দরিয়া-ই-নূরসহ মূল্যবান রত্ন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরূপ জাদুঘরে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করা হতে পারে।
মূল্য ও গুরুত্ব
১৯০৮ সালের হিসেবে দরিয়া-ই-নূরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লক্ষ টাকা। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এর বাজারমূল্য হতে পারে অন্তত ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৬০ কোটি টাকা)।
শুধু আর্থিক মূল্য নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেও এই রত্নকে অমূল্য মনে করা হয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন, শিখ সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি এবং নবাবি এস্টেটের দেউলিয়াত্বের কাহিনি। অনেকে একে কোহিনূরের মতোই “অভিশপ্ত হীরা” বলে অভিহিত করেন।
জনগণের প্রত্যাশা
ইতিহাসবিদ ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই চান দরিয়া-ই-নূরকে জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শন করা হোক। তবে নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতার কারণে এতদিন তা সম্ভব হয়নি।
সরকারি কমিটির কাজ শেষ হলে, হয়তো বহু প্রতীক্ষিত সেই দিন আসবে, যেদিন “আলোর সমুদ্র” সরাসরি দেখতে পাবে বাংলাদেশের জনগণ।