পাকিস্তান ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশকের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে আখ্যা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মনসুন মৌসুমে ভারি বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত ৮১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন আরও ১,১১১ জন। সরকারি হিসেবে, ইতিমধ্যে ১১ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।
ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিএমএ) জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন, যাদের মধ্যে ১৩ জন পাঞ্জাবে ও একজন আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে। মৃত্যু ও আহতদের বেশিরভাগই আকস্মিক প্লাবনে ভেসে যাওয়া অথবা ঘরবাড়ি ধসে পড়ার কারণে।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো। এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ হাজার ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও কয়েক লাখ ঘরবাড়ি। গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
পাঞ্জাব প্রদেশের শাহদারা, কাসুর, চিনিোট, সিয়ালকোট, জঙ্গসহ বিভিন্ন এলাকায় রাভি, শতদ্রু ও চেনাব নদীতে পানি বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে নদীপাড়ের অন্তত ৫০ হাজার পরিবারকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন।
এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে অনেকেই স্কুল, সরকারি অফিস কিংবা খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সংকট দেখা দিয়েছে। ত্রাণকর্মীরা জানাচ্ছেন, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু ও নারী।
পাঞ্জাব সরকার জানিয়েছে, প্রদেশে এখন পর্যন্ত ১.৪৬ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ত্রাণ ও আশ্রয় দেওয়ার জন্য ১,৩৭২টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর দল উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছে। তারা হাজারো লাইফ জ্যাকেট, তাঁবু, শুকনো খাবার, মেডিসিন ও নৌকা সরবরাহ করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বলেছেন—
“রাষ্ট্রের সব ধরনের শক্তি এই দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়োজিত করা হবে। আমরা কোনো মানুষকে একা ছেড়ে দেব না।”
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অভিযোগ তুলেছেন, ভারত নেপথ্যে থেকে বাঁধ খুলে অতিরিক্ত পানি ছাড়ছে, যার কারণে হঠাৎ বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও এখনো এ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইনডাস রিভার সিস্টেম অথরিটি (ইরসা) জানিয়েছে, আগামী ৪ থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সিন্ধু নদীতে পানির প্রবাহ ৮ লাখ কিউসেক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে দক্ষিণ পাকিস্তানজুড়ে আরও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে খাদ্য সংকট, মহামারি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি দেখা দিতে পারে। দেশটির জিডিপিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান পাকিস্তানকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। জাতিসংঘও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ২ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন প্রায় ২ হাজার মানুষ। চলতি বছরের বন্যা পরিস্থিতিকে অনেক বিশেষজ্ঞ সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন।
পাকিস্তানের জন্য এ বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর ত্রাণ কার্যক্রম ছাড়া এই বিপর্যয় মোকাবিলা করা পাকিস্তানের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।