দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকসংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। প্রাথমিক স্কুল থেকে মাধ্যমিক, কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রায় সব স্তরেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান বা তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয়ের শিক্ষক নেই, আবার কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণিতে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের দায়িত্ব বণ্টন, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকার ছোট বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের পৃথক শ্রেণিতে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
মাধ্যমিক স্তরে সংকটের ধরন আরও জটিল। চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়েছে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৪২টি শিক্ষকপদ শূন্য। সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ২০ হাজার ৬৩১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের মাধ্যমিক শাখায় প্রায় ৯০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এসব প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার ৮৬১টিতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, ২ হাজার ৭৪৪টিতে গণিত এবং ২ হাজার ৬২৫টিতে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই।
গত ৮ এপ্রিল সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানান, এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে মোট ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষকপদ শূন্য। এর আগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের সপ্তম বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ৬৭ হাজার ৮৭টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১৮ হাজার ৩৯৯টি। যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১১ হাজার ৭১৩ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা সম্ভব হয়েছে।
কলেজ পর্যায়ে এপ্রিলের সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কলেজে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ৬৫৬টি প্রভাষক পদ এবং সদ্য সরকারি হওয়া কলেজগুলোতে ২ হাজার ৪১০টি নন-ক্যাডার প্রভাষক পদ শূন্য। কারিগরি শিক্ষায় ২৮ জুন সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১৫ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষকপদের মধ্যে ৮ হাজার ৪৮৬টি খালি, অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি।
সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্টরা শুধু নিয়োগের সংখ্যা বাড়ানোর বদলে বাস্তব চাহিদাভিত্তিক জনবল পরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, কোন জেলা-উপজেলায়, কোন বিষয়ে ও কোন স্তরে কতজন শিক্ষক দরকার, তার হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি করা এবং নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বড় সংখ্যক শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে অন্য পদগুলোও পূরণ করা হবে। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির সুযোগ রাখা হবে না বলেও তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদ পূরণ, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিশ্চিত করার কাজ এগিয়ে চলছে।