ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ছুড়েছে হুথিরা। বুধবার (২১ অক্টোবর) এডেন বিমানবন্দর এবং মুকাল্লার আল-রাইয়ান বিমানবন্দরে এ হামলা হয় বলে জানিয়েছে সৌদি মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ। একই সময়ে দেশটির সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা হুথিদের লক্ষ্যবস্তুতে ৮৩৫ দফা আঘাত হেনেছে।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বরাতে আরব নিউজ জানায়, দুটি বেসামরিক ফ্লাইট উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই এডেন বিমানবন্দরের রানওয়েতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সাম্প্রতিক লড়াইয়ে এ নিয়ে চতুর্থবার বিমানবন্দরটি হামলার শিকার হলো। হামলার পর ছাড়ার অপেক্ষায় থাকা ফ্লাইটগুলো বাতিল করে বিমানবন্দর খালি করা হয়।
আল-রাইয়ান বিমানবন্দরে হামলার কথা জানিয়েছেন ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্র। এক সামরিক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, সেখানে জোট বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান থাকা একটি সামরিক ঘাঁটিই ছিল হামলার লক্ষ্য। দুই হামলায় কেউ আহত হননি বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে শহরের বড় অংশ হুথিদের ঘেরাওয়ে থাকা তাইজে একটি কারখানায় হামলা হয়েছে। আরব নিউজের খবরে বলা হয়, এর আগের দিন সেখানকার একটি আবাসিক এলাকায় হুথিদের হামলায় দুই কিশোরী নিহত হয়। প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি হুথিদের ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তারা বেসামরিক মানুষের জীবন, জনগণের স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ‘চাপ আদায়ের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর গত কয়েক মাসে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে শুরু হয়েছে।
সরকারি বাহিনীর দাবি
ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর একজন মুখপাত্রের দাবি, ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ নামের অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় ৮৩৫টি হামলায় প্রায় ২৮৫ জন হুথি যোদ্ধা ও কমান্ডারকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। প্রায় ১৯০টি সামরিক যান ও সরঞ্জাম ধ্বংস বা অকেজো হয়েছে বলেও দাবি তাঁর। এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
মুখপাত্রের ভাষ্য, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান, রকেট লঞ্চার ও স্নাইপার ইউনিট দিয়ে হুথিদের জমায়েত, অস্ত্র, সাঁজোয়া যান, ঘাঁটি ও রসদ সরবরাহের পথে আঘাত হানা হয়েছে। তাইজে হুথিরা হারানো অবস্থান পুনর্দখলের চেষ্টা করলে স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সহায়তায় সরকারি বাহিনী তা ঠেকিয়ে দেয় বলেও তিনি দাবি করেন।
মিসরের সীমারেখা, আমিরাতের দিকে রিয়াদ
এর মধ্যে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বুধবার জানিয়েছেন, সৌদি আরবকে মিসর কোনো সামরিক সহায়তা দিলে তা দেশটির প্রতিরক্ষার মধ্যেই সীমিত থাকবে; ইয়েমেনে হামলা এর অংশ হবে না। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ আল-শেন্নাবির মাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আরব জাতীয় নিরাপত্তা অবিভাজ্য।’
সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার অনুমোদন নিয়ে ভোট মিসরের পার্লামেন্ট ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়েছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, বিদেশে যুদ্ধ মিশনে সেনা পাঠাতে জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ এবং পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন লাগে। আরব নিউজ জানায়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবে হুথিদের হামলা বেড়েছে; ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক হামলায় ১৩ জন বেসামরিক মানুষ নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে টানাপোড়েনের সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে বলে গত মাসে জানিয়েছিল মিডল ইস্ট আই। ২৯ সেপ্টেম্বর রিয়াদে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনসুর বিন জায়েদকে আতিথ্য দেন। দুই পশ্চিমা কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, এরপর ইয়েমেন নিয়ে সমন্বয়ের জন্য আমিরাত কর্মকর্তাদের নিয়ে দুটি উড়োজাহাজ রিয়াদে পাঠায়।
সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো জোশুয়া ইয়াফে মিডল ইস্ট আইকে বলেন, আমিরাত ‘সাদা ঘোড়ায় চড়ে’ সাহায্যের প্রস্তাব নিয়ে আসছে, বিনিময়ে চাইছে সৌদি আরবের সুনজর। তবে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) ও ইসলাহ দল নিয়ে দুই দেশের মতভেদ এখনো কাটেনি বলে বিশ্লেষকদের মত।