বিশ্ব গবেষণাঙ্গনে বাংলাদেশের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের Stanford University এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান Elsevier প্রকাশিত ২০২৬ সালের World’s Top 2% Scientists তালিকায় বাংলাদেশের ৩৪৭ জন গবেষক স্থান পেয়েছেন।
৮ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকদের মধ্যে গবেষণার প্রভাব, প্রকাশনা ও উদ্ধৃতির মতো একাধিক সূচকের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের তালিকায় বাংলাদেশের গবেষকদের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই তালিকায় বাংলাদেশের ২৮৬ জন গবেষক ছিলেন; এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৭-এ—অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১.৩ শতাংশ বৃদ্ধি।
বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম
গবেষকের সংখ্যার হিসাবে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৫তম অবস্থানে রয়েছে। গত বছর দেশটির অবস্থান ছিল ৪৬তম। অর্থাৎ শুধু গবেষকের সংখ্যা বাড়েনি, বৈশ্বিক তালিকাতেও বাংলাদেশের অবস্থানের সামান্য উন্নতি হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ বছর বাংলাদেশের ৮৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষকরা তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৭৪। অর্থাৎ এক বছরে তালিকায় প্রতিনিধিত্বকারী বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এটি বাংলাদেশের গবেষণা কার্যক্রম যে শুধু কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিস্তৃত হচ্ছে—তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তালিকা কীভাবে তৈরি হয়?
World’s Top 2% Scientists তালিকাটি সাধারণ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং নয়। গবেষকদের বৈজ্ঞানিক কাজের প্রভাব পরিমাপ করতে বিভিন্ন bibliometric indicator বা গবেষণাভিত্তিক সূচক ব্যবহার করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে—
- গবেষণাপত্রের সংখ্যা ও প্রভাব
- গবেষণাপত্র কতবার উদ্ধৃত হয়েছে বা citation
- h-index
- গবেষণার ধারাবাহিকতা
- সহ-লেখকদের গবেষণা-প্রভাব
- একক, প্রথম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ author position-এ প্রকাশিত গবেষণার citation impact
২০২৬ সালের single-year মূল্যায়নে মূলত আগের বছরের গবেষণা ও তার citation impact বিবেচনা করা হয়েছে। একই ডেটাবেসে single-year impact এবং career-long impact—দুটি পৃথক তালিকাও থাকে।
ফলে তালিকায় স্থান পাওয়া মানে শুধু একজন গবেষক অনেকগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন—এমন নয়; বরং তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে University of Dhaka সবচেয়ে বেশি গবেষক নিয়ে তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ২২ জন শিক্ষক ও গবেষক ২০২৬ সালের তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
এরপর রয়েছে icddr,b—প্রতিষ্ঠানটির ২০ জন গবেষক তালিকায় জায়গা পেয়েছেন।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়—দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৬ জন করে গবেষক তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়বা BUET থেকে ১৫ জন গবেষক তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
কয়েক বছরে ধারাবাহিক অগ্রগতি
বাংলাদেশের গবেষকদের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির এই বৃদ্ধি আরও স্পষ্ট হয় কয়েক বছরের তথ্য পাশাপাশি রাখলে।
২০২০ সালে বাংলাদেশের ৫৬ জন গবেষক এই তালিকায় ছিলেন। এরপর সংখ্যা বেড়ে ২০২১ সালে ৯৭, ২০২২ সালে ১৪৭, ২০২৩ সালে ১৭৭, ২০২৪ সালে ২০৫ এবং ২০২৫ সালে ২৮৬ জনে পৌঁছায়। ২০২৬ সালে তা আরও বেড়ে হয়েছে ৩৪৭ জন।
অর্থাৎ মাত্র ছয় বছরে তালিকায় বাংলাদেশের গবেষকের সংখ্যা ছয় গুণেরও বেশি হয়েছে। যদিও এই বৃদ্ধিকে সরাসরি দেশের সামগ্রিক গবেষণার মানের সমানুপাতিক সূচক হিসেবে দেখা উচিত নয়, তবু আন্তর্জাতিক citation-based গবেষণা সূচকে বাংলাদেশি গবেষকদের দৃশ্যমানতা বাড়ার প্রবণতাটি স্পষ্ট।
শুধু পুরোনো প্রতিষ্ঠান নয়, বাড়ছে নতুন প্রতিষ্ঠান
২০২৬ সালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি। ২০২৫ সালে যেখানে বাংলাদেশের ৭৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষকরা তালিকায় ছিলেন, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮৮।
এর অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও গবেষকেরা বৈশ্বিক গবেষণা সূচকে জায়গা করে নিচ্ছেন।
এ ধরনের স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা প্রকাশনা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্জনের পাশাপাশি সামনে বড় প্রশ্ন
তবে ৩৪৭ জন গবেষকের এই সাফল্যকে শুধু গর্বের খবর হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। বাংলাদেশের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই গবেষকদের সাফল্যকে কীভাবে আরও বড় একটি জাতীয় গবেষণা সক্ষমতায় রূপ দেওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অর্থায়ন, আধুনিক ল্যাবরেটরি, নির্ভরযোগ্য গবেষণা অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দক্ষ গবেষণা সহকারী এবং তরুণ গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ। একই সঙ্গে গবেষণার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণার মৌলিকত্ব ও বাস্তব সমস্যার সমাধানে এর প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত
বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক গবেষণা পরিমণ্ডলে বড় গবেষণা শক্তিগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। কিন্তু ২০২০ সালের ৫৬ জন থেকে ২০২৬ সালে ৩৪৭ জনে পৌঁছানোর ধারাবাহিকতা একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় বাংলাদেশি গবেষকদের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই উপস্থিতি এখন আর কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
৩৪৭ জন গবেষকের এই স্বীকৃতি তাই শুধু ৩৪৭টি ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গবেষণা সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পরিসরে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠারও একটি প্রতিচ্ছবি।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হবে—এই অগ্রগতিকে বিচ্ছিন্ন সাফল্য হিসেবে না রেখে আরও বেশি গবেষক, আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী গবেষণায় রূপান্তর করা।