আল জাজিরার অনুকরণে
প্রতীকী হলেও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ
জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে ঘোষণা দেন—তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন।
এটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর একটি অনুপস্থিত পদক্ষেপ ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিদা আবু রাস বলেন, “এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে আরও একঘরে করে দিয়েছে। এতদিন এসব দেশ আলোচনার পর সমাধান এলে তবেই স্বীকৃতি দেবে বলে জানাত। কিন্তু তারা এবার ভিন্ন পথে হাঁটল।”
গাজায় রক্তপাত চলছেই
ঘোষণার দিনই ইসরায়েলের বোমাবর্ষণে অন্তত ৫৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন, যার মধ্যে ৩৭ জন গাজা শহরে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই চলমান আক্রমণকে সরাসরি গণহত্যা আখ্যা দিয়েছে। অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ৬৫ হাজার ২৮৩ জনে। আহত হয়েছেন এক লাখ ৬৬ হাজারেরও বেশি।
অন্যদিকে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও দখলদার ইহুদি বসতকারীদের সহিংসতায় নিহত হয়েছেন আরও এক হাজারের বেশি মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ইসরায়েলের পশ্চিম তীর সম্পূর্ণভাবে দখলের পরিকল্পনার আশঙ্কা বাড়ছে।
‘মুখ বাঁচানো’ নাকি প্রকৃত সহমর্মিতা?
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, পশ্চিমা নেতারা প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনের পক্ষে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, “এটি মূলত প্রতীকী বা পারফরমেটিভ পদক্ষেপ। তারা স্থানীয় জনগণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে কিছু একটা করছে বলে দেখাতে চাইছে।”
এ মতের প্রতিধ্বনি করে গবেষক ক্রিস ওসিয়েক বলেন, “যদি অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা দখলকৃত অঞ্চলে নো-ফ্লাই জোনের মতো পদক্ষেপ না আসে, তবে এর কোনো বাস্তব প্রভাব পড়বে না।”
কূটনৈতিক নতুন পথ
তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির পর নতুন কিছু কূটনৈতিক সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্য এখন ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে হুসাম জোমলতকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জোমলত বলেন, “এটি বহু প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের সূচনা এবং ব্রিটেনের ঐতিহাসিক দায় স্বীকারের অংশ।”
সীমাবদ্ধতাই বেশি
জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের অবস্থান এখনো ‘নন-মেম্বার অবজারভার স্টেট’। পূর্ণ সদস্য হওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ প্রয়োজন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর এ স্বীকৃতি বাস্তবে জাতিসংঘে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারছে না।
ইউরোপে চাপ বাড়ছে
ইতিমধ্যেই ফ্রান্স, পর্তুগালসহ আরও কিছু ইউরোপীয় দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ইসরায়েলি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো ও কিছু নেতার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে ইউরোভিশন ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে ইসরায়েলকে বহিষ্কারের দাবিও জোরদার হচ্ছে।
ইতিহাসের দায়
যুক্তরাজ্যের জন্য এ সিদ্ধান্তের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ১৯১৭ সালের বালফোর ঘোষণা এবং পরবর্তী ঔপনিবেশিক ভূমিকার কারণে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ঐতিহাসিক দায় তাদের ওপর বর্তায়। তাই ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, “দুই-রাষ্ট্র সমাধানে যুক্তরাজ্যের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি স্বীকৃতি কেবল রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলার কৌশল হয়ে থাকে, তবে তা ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন বাস্তবতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে না। বাস্তব পরিবর্তনের জন্য দরকার অর্থনৈতিক অবরোধ, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং সাংস্কৃতিক বয়কটের মতো দৃঢ় পদক্ষেপ।
অন্যথায়, এই স্বীকৃতি ইতিহাসে প্রতীকী এক ঘটনা হয়েই সীমিত থাকবে।