শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

আটার অভাবে বন্ধের পথে বেকারি, কমছে ত্রাণ: গাজায় ফের দুর্ভিক্ষের শঙ্কা

বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে ইসরায়েলি কড়াকড়ি ও ডব্লিউএফপির খাদ্যসহায়তা এক-তৃতীয়াংশ কমানোর মধ্যে গাজায় আটা ফুরিয়ে আসছে, বাড়ছে দাম; আবার দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।

অবরুদ্ধ গাজায় খাদ্যের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর একই সময়ে কমছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ। এতে উপত্যকার বাসিন্দারা আবার দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন। সৌদি দৈনিক আরব নিউজ, যুক্তরাজ্যভিত্তিক মিডল ইস্ট আই এবং তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

আরব নিউজ জানিয়েছে, গাজার বেকারি সমিতির প্রধান আবদুল নাসের আল-আজরামি ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফাকে বলেছেন, আটার মজুত শেষ হয়ে গেছে। এখন মাত্র সাতটি বেকারি চালু আছে; নতুন চালান না এলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেগুলোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ক্রসিং বন্ধ রাখা এবং বাণিজ্যিক আটার চালান ঢুকতে না দেওয়ার জন্য তিনি ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন। জেনেভাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের বরাতে আনাদোলু জানিয়েছে, আটা ও জ্বালানির অভাবে সম্প্রতি গাজা সিটির দুটি বড় বেকারিসহ কয়েকটি বেকারি বন্ধ হয়ে গেছে।

ইউরো-মেডের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ইসরায়েল গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ স্থগিত করে। ১৯ অক্টোবর কিছু আমদানি আবার চালুর কথা বলা হলেও চালান এখনো কঠোরভাবে সীমিত, তাজা ফলমূল ও সবজি ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সংগঠনটির হিসাবে, এখন যে পণ্য ঢুকছে তাতে বাসিন্দাদের চাহিদার ৩৭ শতাংশের বেশি মেটে না। শুক্র ও শনিবার ক্রসিং বন্ধ থাকে, আর রোববার সরবরাহ আবার শুরু হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেসামরিক বিষয় সমন্বয়কারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট বলছে, হামাস প্রতি ট্রাকে ১০ হাজার শেকেল ফি এবং বিক্রির ৩০ শতাংশ নগদে দেওয়ার শর্ত চাপানোয় ব্যবসায়ীরাই চালান বন্ধ রেখেছেন। হামাসের গণমাধ্যম দপ্তর একে ‘স্পষ্ট অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছে, অর্থটি অভাবী মানুষের সহায়তা তহবিলে স্বেচ্ছায় দেওয়া অনুদান। গাজার বেসরকারি ট্রাকচালক ইউনিয়নের প্রধান নাহেদ শেহেইবারও ইসরায়েলের ব্যাখ্যা নাকচ করে বলেছেন, বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরায়েলই।

কমছে ত্রাণ, বাড়ছে দাম

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ১৯ অক্টোবর জানায়, তহবিল সংকটে তারা গাজায় খাদ্যসহায়তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমাতে বাধ্য হচ্ছে; এতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ জরুরি সহায়তা থেকে বাদ পড়বেন। আরব নিউজ জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বেকার এবং প্রায় ৯০ শতাংশ মানবিক খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির সমন্বিত শ্রেণিবিন্যাস আইপিসির হিসাবে, ১৪ লাখ মানুষ বা জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ সংকট বা তার চেয়ে খারাপ মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আছেন।

মিডল ইস্ট আইকে গাজা সিটির বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা আহমেদ জেলো বলেন, ২৫ কেজির এক বস্তা সাদা আটা আগে ৭০ শেকেলে পাওয়া যেত, এখন লাগছে ১৫০ শেকেল; এক ট্রে ডিমের দাম ২৮ থেকে বেড়ে ৫৫ শেকেল হয়েছে। তাঁর মতে, গাজায় প্রতিবার অনাহার শুরু হয়েছে এমন ত্রাণ কাটছাঁট দিয়েই। গাজা সিটির পশ্চিমে তাল আল-হাওয়ায় আশ্রয় নেওয়া নাসের আল-শুরাফা জানান, তিনি যে তিনটি বেকারিতে গিয়েছিলেন, সীমান্ত বন্ধ থাকায় সাদা আটার অভাবে তিনটিই বন্ধ পেয়েছেন। নয় সদস্যের পরিবার নিয়ে তাঁবুতে থাকা ওলা শামালির কথায়, ত্রাণ কমানোর মানে তাঁদের এখন ‘দুর্ভিক্ষের কিনারায়’ বাঁচতে হবে।

ইউরো-মেড ইসরায়েলকে অত্যাবশ্যক পণ্যের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিতে এবং আন্তর্জাতিক দাতাদের খাদ্যসহায়তা বাড়িয়ে বেকারিগুলো আবার চালু করতে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।