গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার একটি অংশসহ চট্টগ্রাম পর্যন্ত বেশ কিছু জেলায় যে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয়েছিল, তার সূত্রপাত হয়তো মেঘনা ঘাট–হরিপুর সঞ্চালন লাইনের নিচের আকাশমণি গাছ থেকে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে এমন একটি উৎস শনাক্তের কথা জানালেও কারণ নিশ্চিত করেননি। বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে এর আগে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
ওই দিন দুই ঘণ্টা বহু মানুষ বিদ্যুৎ পাননি। এটি চাহিদা-ঘাটতি সামাল দেওয়ার লোডশেডিং ছিল না; বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণেই এমনটি হয়েছে। পাওয়ার গ্রিডের চারজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, যাঁদের মধ্যে তদন্ত কমিটির দুজনও আছেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিপর্যয়ের কারণ সঙ্গে সঙ্গে জানা যায় না, বের করতে কয়েক দিন লাগে। তাঁরা বলেন, হাইভোল্টেজ গ্রিড লাইনের নিচে কয়েকটি আকাশমণি গাছ পাওয়া গেছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, লাইনের কাছে গাছের ডাল থাকলে তা নিয়মিত টহল দল কেটে দেয়। মেঘনা ঘাট–হরিপুর লাইনের মাঝামাঝি একটি এলাকায় আকাশমণি গাছ আছে, যেগুলো কাটার দু-তিন দিনের মধ্যেই হয়তো একটি গাছের ডাল বেড়ে উঠেছিল। ডালটি লাইন স্পর্শ না করলেও হাইভোল্টেজ লাইনের দুই মিটারের মধ্যে এলে ‘ফ্লাশ ওভার’ হয়ে শর্টসার্কিট হতে পারে বলে তাঁরা জানান। তবে এ কারণেই বিপর্যয় হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি পাওয়ার গ্রিডের কর্মকর্তারা। সাধারণত গ্রিড বিপর্যয়ে অবকাঠামোগত ক্ষতি চোখে পড়ে, এবার তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাধারণত দুটি সার্কিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয়। উদাহরণ হিসেবে মেঘনা ঘাট–হরিপুর লাইনে দুটি সার্কিটের প্রতিটির সক্ষমতা ২০০ মেগাওয়াট, মোট ৪০০ মেগাওয়াট। বিপর্যয়ের আগে প্রতিটিতে ১৫০ মেগাওয়াট করে সরবরাহ হচ্ছিল। একটি সার্কিট বন্ধ হওয়ার পর অন্যটিতে ৩০০ মেগাওয়াট লোড চলে যায়; সক্ষমতার বাড়তি এই চাপ নিতে না পেরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায় এবং একের পর এক লাইন বন্ধ হতে থাকে। খাতসংশ্লিষ্ট একজন বলেন, একটি সার্কিট বন্ধ হলে অন্যটির পুরো লোড নেওয়ার সক্ষমতা থাকা দরকার, কিন্তু সে জন্য বিনিয়োগের ঘাটতি আছে; পাওয়ার সিস্টেম সিকিউরিটি মূল্যায়ন না করলে বারবার বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকে যাবে।
এ বিষয়ে মেঘনা ঘাট–হরিপুর লাইনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এমরান আলী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দেশে এর আগেও জাতীয় গ্রিডে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর বেলা ২টা ৫ মিনিটে পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিডে বিপর্যয় শুরু হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বড় অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে এবং তিন থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। ২০১৭ সালের ৩ মে উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের ৩২টি জেলা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল। ২০১৪ সালে গোটা দেশ প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।