সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার—ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এক সময়ের দৃঢ় কণ্ঠস্বর, যিনি পরবর্তীতে সিপিবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বাম রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে হতাশা আর রাজনৈতিক আস্থাহীনতার ভার তিনি আর বইতে পারেননি।
নিজের আত্মহননের আগে তিনি ‘খোলা চিঠি’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ লেখা পাঠান বিডিনিউজ২৪-এ। সেখানে তিনি তুলে ধরেন ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পেশাগত নানা সংকটের কথা।
চিঠিতে তিনি লেখেন, তার ছেলে বুয়েট থেকে পাস করেও চাকরি পাননি, মেয়ে সরকারি চিকিৎসক হলেও উচ্চতর পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। নিজে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেও আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে ছিলেন।
তিনি স্বীকার করেন—
"শেখ হাসিনার শাসনামলে নানা পরিচয়ে অনেকে অনেক সুবিধা নিয়েছেন। আমি দুইবার আবেদন করেও কোনো প্লট পাইনি। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে বই লিখেও কোনো রয়্যালটি পাইনি।"
তার ভাষায়, “একবার শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওই সফরের হাতখরচের টাকা দিয়েই কেবল কোট-জুতো কেনা সম্ভব হয়েছিল। সারাজীবন তো স্যান্ডেলেই কাটলো।”
বাম রাজনীতির অনুসারী হলেও বিভুরঞ্জন সরকারের লেখায় ভারতপ্রীতি ও আওয়ামী লীগের প্রতি নরম অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। সমালোচকরা তাকে অনেক সময় “ভারতের বয়ান বহনকারী” বলেও কটাক্ষ করতেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক আন্দোলন ও ‘বর্ষা বিপ্লবের’ পর তার ধারণা ভেঙে পড়ে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ভারতের প্রত্যক্ষ প্রভাব কিংবা শেখ হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। এই উপলব্ধিই তাকে গভীর মানসিক সংকটে ফেলে।
তবু শেষ লেখায়ও তিনি লিখে গেছেন—
"শুধু পুলিশের গুলিতে নয়, মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে জঙ্গিরাও মানুষ হত্যা করেছে। এখানে অসত্য তথ্য কোথায়?"
তার এই অবস্থান সমালোচনার জন্ম দেয়, বিশেষত আন্দোলনরত জনতার ওপর পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনায় তিনি দায়ভার অন্যত্র চাপানোর চেষ্টা করেছেন বলেই মন্তব্য করছেন অনেকে।
শেষ চিঠিতে তিনি গণমাধ্যমে নিজের অবস্থান নিয়েও লিখেছেন—
"গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের অবস্থা আরও কাহিল হয়েছে। নির্বাহী সম্পাদকরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন। আমার লেখা নিয়েও চাপ এসেছে। সম্পাদক এমনকি আমার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করেছেন।"
সব মিলিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—
“আমি এখন কি করি? কোন পথে হাঁটি?”
শেষ লেখাটি পাঠানোর পর তিনি মোবাইল ফোনটিও বাসায় রেখে যান, যেন তাকে ট্রেস করা না যায়। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গিয়ে মেঘনার জলে ঝাঁপ দেন বলে ধারণা করা হয়।
বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন ও মৃত্যু এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সাংবাদিকতা পেশাকে। তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, মতাদর্শিকভাবে স্পষ্ট, কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি হারিয়ে ফেলেন নিজের স্থিরতা ও আশার আলো। ‘শেষ চিঠি’তে তিনি যে যন্ত্রণার কথা বলেছেন, তা কেবল একজন সাংবাদিক বা রাজনৈতিক কর্মীর নয়, বরং আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।