জাসদের কার্যালয়ে গোপন বৈঠকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: ২৬০ জনের বেশি আটক, চলছে জিজ্ঞাসাবাদ
রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা থেকে আওয়ামী লীগ কর্মী সন্দেহে ২৬০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের (ইনু) প্রধান কার্যালয়ের কর্নেল তাহের মিলনায়তনে গোপন বৈঠক চলাকালীন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনতে পান স্থানীয় হকার ও ব্যবসায়ীরা। শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ের ৩৫ নম্বর ভবনের (হোটেল গ্যানিস ইন্টারন্যাশনাল) দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত জাসদের এই কার্যালয়ে সকাল ১০টা থেকে বিভিন্ন সারির নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে সভা শুরু হয়।
এই স্লোগান শুনতে পেয়ে আশপাশের ব্যবসায়ী ও হকাররা কার্যালয়টি ঘেরাও করেন এবং পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ২৬০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে আটক করে। আটকদের রাখার জন্য পল্টন থানায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় বেশ কয়েকজনকে শাহবাগ থানায় নিয়ে রাখা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে জড়ো হন। তারা ভবনটি ঘিরে রাখেন এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে লোকজনের ভিড়ের কারণে এক পাশের সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যও আটক হন। তিনি দাবি করেন, সেখানে তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। তবে পুলিশ যখন তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়, তখন সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেনÑকেন তিনি এমন সভায় এসেছেন। এর কোনো যৌক্তিক উত্তর তিনি দিতে পারেননি। এ সময় শাহবাগ থানা বিএনপিকর্মী শরিফ জানান, জাসদ অফিসের ওই মিলনায়তনে পাঁচ শতাধিক লোক ছিলেন এবং তারা সুযোগ বুঝে সেখান থেকে চলে যান। কাপড় ব্যবসায়ী সবুজ বলেন, এ কার্যালয়ে দীর্ঘদিন তাদের আনাগোনা ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, আটকদের পরিচয় যাচাই-বাছাই এবং ট্র্যাক রেকর্ড খুঁজে বের করার জন্য দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের ডিসি আকতার হোসেন জানান, জাসদ কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে বৈঠক চলছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। পল্টন থানার ওসি আরিফুর ইসলাম বলেন, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ জানান, আটকদের থানায় নিয়ে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং শাহবাগ থানা যুবদলের সদস্য সচিব মোয়াজ্জেম হোসেন তপন অভিযোগ করেন যে, এই গোপন বৈঠকে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল। রবিউল ইসলাম নয়ন বলেন, পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিদেশে বসে নানা হুমকিধমকি দিচ্ছে। এই গোপন বৈঠকে কোনো ষড়যন্ত্র করা হছিল কি না তা পুলিশকে খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের ‘দোসররা’ যাতে ঢাকার কোথাও মিছিল-মিটিং করতে না পারে; সে বিষয়ে ঢাকা মহানগর যুবদলের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। মোয়াজ্জেম হোসেন তপন অভিযোগ করেন, কুষ্টিয়া, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক নিয়ে এসে তারা গোপন বৈঠক করছিল এবং দেশে জ্বালাও-পোড়াও করার জন্য তারা ওই বৈঠক করছিল।
উপপুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ আরও জানান, জাসদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা একত্রিত হয়ে নাশকতা বা অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশে জড়ো হয়েছিল কি না তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তাদের কাছে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার তথ্য রয়েছে। এছাড়া তারা কোনো কর্মকাণ্ড করেছে কি না বা কেন জড়ো হয়েছিল সেটি যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় ছাত্র-জনতা পুলিশকে সহযোগিতা করেছে।
অন্যদিকে, জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন যে, শনিবার সকালে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা ছিল। তিনি বলেন, সারা দেশ থেকে প্রায় ৪০০ নেতাকর্মী প্রতিনিধি সভায় যোগ দেন এবং সকাল সাড়ে ১০টায় তাদের অনুষ্ঠান শুরু হয়। সাজ্জাদ হোসেন আরও দাবি করেন, প্রথমে বিএনপির নেতাকর্মীরা এসে তাদের নেতাকর্মীদের মারধর করেন এবং পরে বিকালে পুলিশ এসে নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করে। তিনি বলেন, তাদের কোনো নেতাকর্মী বের হতে পারেননি।
আটকদের পরিচয় যাচাই-বাছাই ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। স্নিগ্ধা নামে একজন এনসিপির গুলশান থানার নেত্রী দাবি করেন, তার বাবা রুহুল আমিন, যিনি আগে জাসদ করতেন এবং বর্তমানে করেন না, তিনি আটক হয়েছেন। তার বাবা গাইবান্ধার গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছেন এবং ফোনে তাকে আটক হওয়ার খবর দিয়েছেন। তবে পুলিশ এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি বলে স্নিগ্ধা জানান।