দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা চাকরির ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা বৈষম্য নিরসনের দাবিতে এক অভূতপূর্ব আন্দোলনে নেমেছেন। 'প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন'-এর ব্যানারে এই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদানের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা। বুয়েট, রুয়েট, শাবিপ্রবি, হাবিপ্রবি, এবং পবিপ্রবি সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভগুলো দেশের প্রকৌশল খাতে বিদ্যমান একটি গভীর সংকটকে সামনে এনেছে।
বিক্ষোভ ও মূল দাবিসমূহ
এই আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা তিনটি প্রধান দাবিকে কেন্দ্র করে তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দাবিগুলো মূলত প্রকৌশলী পেশায় যোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করতে এবং নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অসমতা দূর করতে প্রণীত হয়েছে।
- সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ: বিএসসি প্রকৌশলীদের প্রধান দাবি হলো, সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের নবম গ্রেডের পদে নিয়োগের জন্য শুধুমাত্র বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা। তারা বলছেন, এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত ৩৩ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হোক। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এ ধরনের কোটা ব্যবস্থা মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপন্থী এবং এটি দেশের প্রকৌশল ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতি সৃষ্টি করছে।
- উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে সুযোগ: আন্দোলনকারীরা চান যে, টেকনিক্যাল দশম গ্রেড বা উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা এবং বিএসসি উভয় ডিগ্রিধারীকেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। তাদের দাবি, এটি একটি ন্যায্য পদ্ধতি যা উভয় পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে।
- 'ইঞ্জিনিয়ার' পদবির ব্যবহার: বিএসসি প্রকৌশলীদের তৃতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশলী ইনস্টিটিউট (IEB)-এর স্বীকৃতি ছাড়া কাউকে 'ইঞ্জিনিয়ার' পদবি ব্যবহার করতে না দেওয়ার জন্য একটি সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করে গেজেট প্রকাশ করা। তাদের অভিযোগ, ডিপ্লোমা ডিগ্রিপ্রাপ্তরা আইনসম্মত অধিকার ছাড়াই 'ইঞ্জিনিয়ার' পদবি ব্যবহার করে বিএসসি প্রকৌশলীদের পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছেন।
এই আন্দোলন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রকৌশলী এবং ডিপ্লোমাধারীদের মধ্যে বিদ্যমান একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে প্রকাশ করেছে। উভয় পক্ষই একে অপরের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলছে। বিএসসি প্রকৌশলীরা বলছেন যে, ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা বিসিএস পরীক্ষার মতো কঠিন ধাপগুলো অতিক্রম না করেই সরাসরি 'ইঞ্জিনিয়ার' পরিচয়ে চাকরি করছেন। এমনকি, তারা মাত্র পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে বিসিএস ক্যাডার সমমানের নবম গ্রেডের পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন, যা বিএসসি প্রকৌশলীদের পদোন্নতির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নবম ও দশম গ্রেডের পদগুলো অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
অন্যদিকে, ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন যে তারা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। তারা মনে করেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং পদ ব্লক করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাদের মতে, বিএসসি প্রকৌশলীরা একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং শিক্ষকবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করেছেন। রুয়েট, শাবিপ্রবি, এবং পবিপ্রবি-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্দোলনকে সমর্থন জানানো হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মনোবলকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের এই দাবিগুলো যদি দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হয়, তাহলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হবেন।
এই আন্দোলন কেবল কিছু শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ নয়, বরং এটি দেশের প্রকৌশল পেশার ভবিষ্যৎ এবং কর্মক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক নিয়োগের মানদণ্ড নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটি সরকারের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে যে কীভাবে দেশের প্রকৌশল খাতে ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।