বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

সুখরঞ্জন বালীর মামলা: শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

এক যুগ আগে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে গুম হওয়া সুখরঞ্জন এবার ট্রাইব্যুনালে বিচার দাবি করলেন

Sukhranjan Bali
ছবি: সংগৃহীত

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে গুম হওয়া সুখরঞ্জন বালী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগে তিনি অপহরণ, গুম, নির্যাতন ও অবৈধভাবে পাঁচ বছর কারাবাসের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়ে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

এক যুগ আগে আলোচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে গুম হওয়া পিরোজপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিক সুখরঞ্জন বালী অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট ২০২৫) সকালে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর ৩২ জনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগে সুখরঞ্জন উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে তার ভাই বিশেশ্বর বালীকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। এ ঘটনার সত্য সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন তাকে জোর করে আল্লামা সাঈদীর নাম বলার জন্য চাপ দেন। কিন্তু তিনি মিথ্যা সাক্ষ্যে অস্বীকৃতি জানান। এর পরপরই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, এমপি এ.কে.এম. আউয়াল, মেয়র হাবিবুর রহমান মালেকসহ ছাত্রলীগ–যুবলীগ নেতারা তাকে হুমকি ও শারীরিক নির্যাতন করেন।

ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে অপহরণ

২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এসে আইনজীবীদের সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশের সময়ই সাদা পোশাকের পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তুলে নেয়। এরপর দীর্ঘদিন তাকে অন্ধকার কক্ষে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।

ভারতের কারাগারে পাঁচ বছর

পরবর্তীতে তাকে সীমান্তে পাচার করে দিয়ে ভারতের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে প্রথমে বশিরহাট জেল এবং পরে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি টানা পাঁচ বছর অবৈধভাবে আটক ছিলেন। কারাগারে তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা সাক্ষাৎ করেন এবং নির্যাতনের বর্ণনা নথিভুক্ত করেন।

অভিযোগপত্রে যাদের নাম

সুখরঞ্জনের মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছেন—

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা,

ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম,

সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ,

আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম,

ট্রাইব্যুনালের বিচারক এটিএম ফজলে কবির,

তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন,

পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক এমপি এ.কে.এম. আউয়াল,

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী,

প্রসিকিউটর রানা দাস গুপ্ত,

তদন্ত সংস্থার প্রধান মো. সানাউল হক,
এছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের আরও কয়েকজন নেতাকর্মীর নামও উল্লেখ করেছেন তিনি।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে আপিলে শাস্তি কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের আগস্টে তিনি কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সুখরঞ্জন অভিযোগ করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা ছিল “সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো” এবং কারাগারে তার মৃত্যু ছিল “পরিকল্পিত হত্যা”।

নিজের অভিযোগে সুখরঞ্জন বালী বলেন—

“আমাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, নির্যাতন ও পাচার করা হয়েছে। আমার মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। আমি এর ন্যায়বিচার চাই এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”