আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সেজে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে এক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নেওয়া এবং ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়ার ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২১ অক্টোবর ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফে একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশ থেকে ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বৃহস্পতিবার সকালে জানান, ঘটনাটি সাধারণ অপহরণ নয়; বাহিনীর পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের একটি পরিকল্পিত কৌশল। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য, যাঁর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
দোকান থেকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নেওয়া
পুলিশ ও মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ইউনিয়নের প্রেমবাজারে ওই ব্যবসায়ীর দোকানে কয়েকজন ব্যক্তি ঢোকেন। তাঁদের গায়ে ছিল কালো পোশাকের ওপর এসআরবি লেখা কটি, মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁরা নিজেদের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্য বলে পরিচয় দেন। ব্যবসায়ীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর দুই হাত পেছনে বেঁধে হাতকড়া পরানো হয় এবং টেনে দোকান থেকে বের করে নেওয়া হয়।
এরপর বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে ভুক্তভোগীর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না পেলে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ আছে। ১৯ অক্টোবর সোমবার বাঁশখালী থানায় মামলা হয়।
কক্সবাজারের পাঁচ উপজেলায় অভিযান
জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ যৌথভাবে তদন্তে নামে। প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা তথ্যের সূত্র ধরে কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফে অভিযান চালানো হয়। ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদরের বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে ধরা হয়।
পুলিশ জানায়, তাঁদের দেওয়া তথ্যে ২১ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রবিউল হক প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধারের পর তাঁকে থানায় আনা হয় এবং পরে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। অভিযানে একটি প্রাইভেট কার, এসআরবি লেখা পাঁচটি কালো কটি, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হাতকড়া জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ছয়জন ও তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সুমন মুন্সি (৩২), মিজানুর রহমান (২৯), জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনু (২৮), আব্বাস উদ্দিন (৩১), ছলিম ওরফে সেলিম (৩০) ও দেলোয়ার হোসেন (৪০)।
পুলিশের দাবি, সুমন মুন্সি একসময় উখিয়া এলাকায় এসআরবিতে কর্মরত ছিলেন; প্রথম আলো পুলিশের বিজ্ঞপ্তির বরাতে লিখেছে, তিনি র্যাবে (বর্তমানে এসআরবি) কাজ করতেন। পরে নানা অপরাধে জড়ানোর অভিযোগে চাকরি হারান এবং কারাভোগ করেন। জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ বলছে, এরপর তিনি ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে একটি দল গড়ে তোলেন। পুলিশ সুপারের ভাষ্য, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন সম্ভাব্য লক্ষ্যের চলাফেরা নজরে রেখে সুমনকে খবর দিতেন; এরপর দলটি তুলে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে টাকা আদায়ের চেষ্টা করত।
পুলিশ জানিয়েছে, সুমনের বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্রসংক্রান্ত ১৩টি মামলা আছে। এ ছাড়া জয়নালের বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি, আব্বাসের বিরুদ্ধে মাদক আইনে একটি এবং ছলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার বর্তমান অবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত ও বিচারে প্রমাণসাপেক্ষ।
সরঞ্জামগুলো কোথা থেকে জোগাড় করা হয়েছিল, একই কৌশলে আগে আর কাউকে তুলে নেওয়া হয়েছে কি না এবং মুক্তিপণ চাওয়ার নম্বরগুলোর সঙ্গে আর কারা যুক্ত, তা এখন খতিয়ে দেখছে পুলিশ।