খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) নিয়োগের সময় বয়স গোপন, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা জালিয়াতিসহ শৃঙ্খলা ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পাঁচ শিক্ষক এবং দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ভিত্তিতে প্রশাসনিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতজনই দীর্ঘদিন ধরে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অমান্য, নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ, বয়সের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন এবং অস্তিত্বহীন গবেষণা নিবন্ধ ব্যবহারের মতো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
চাকরিচ্যুত শিক্ষকেরা হলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক পিন্টু চন্দ্র শীল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক সুব্রত তলাপাত্র, এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডল, মানবিক ও ব্যবসায়িক শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক মাসরুরা মোস্তফা এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমান। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি ও অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সুব্রত তলাপাত্র ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর প্রভাষক পদে যোগ দেন। আবেদনের সময়ই তাঁর বয়স কুয়েটের নির্ধারিত ৩০ বছরের সীমার বেশি ছিল। মাসরুরা মোস্তফা বয়সসীমা পার হওয়ার পর প্রভাষক পদে আবেদন করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে; পরে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হওয়ার সময় তিনি যে অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছিলেন, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নীতিমালায় গ্রহণযোগ্য নয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে জোড়া জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। শাহরিয়ার রোমানের বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তিতে অনার্স ও মাস্টার্স দুটিতেই প্রথম শ্রেণি বাধ্যতামূলক হলেও তিনি দুটিতেই দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়েছিলেন। সহকারী অধ্যাপক পদের আবেদনে তিনি দুটি গবেষণা নিবন্ধের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যা তদন্তে অস্তিত্বহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। নিবিড় মণ্ডলের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি যোগদানের সময় কুয়েটের নীতিবহির্ভূতভাবে একটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছিলেন; সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় অনুমতি নিয়ে বিদেশে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরেননি এবং কর্মস্থলে আর যোগ দেননি।
পিন্টু চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা তাঁর অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন বলে তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি সেকশন অফিসার পদে নিয়োগের সময় মিথ্যা অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিয়েছিলেন। অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স কমিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
কুয়েটের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান ভূঞা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুসারেই তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, "অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই একাধিক অনিয়মের সত্যতা ছিল, যার কারণে তাঁদের বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে গঠিত তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও অভিযুক্তদের কাছ থেকে কৈফিয়ত ও ব্যাখ্যা তলব শেষে অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"