বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্র—তারপরও কেন অস্থির রাজনীতি কাটছে না নেপালের

নেপালের গণতন্ত্রের সংগ্রাম: এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ

নেপাল নিউজ
ছবি: সংগৃহিত। নেপাল নিউজ

জতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ২০০৮ সালে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয় নেপাল। জনগণ তখন স্বপ্ন দেখেছিল স্থিতিশীল গণতন্ত্রের। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশটি এখনও রাজনৈতিক অস্থিরতা, নেতৃত্বের টানাপোড়েন আর দলীয় বিভাজনের দুষ্টচক্রে আটকে আছে। সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভ ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ আবারও প্রশ্ন তুলেছে—গণতন্ত্রের পথে নেপাল কি সত্যিই এগোচ্ছে, নাকি আরও পেছাচ্ছে?

রাজতন্ত্রের পতন: গণতন্ত্রের সূচনা

দীর্ঘদিন নেপাল শাসিত হয়েছে শাহ রাজবংশের অধীনে। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে বহুদলীয় ব্যবস্থা চালু হলেও রাজতন্ত্র তখনও অক্ষুণ্ণ ছিল। পরবর্তী সময়ে মাওবাদী বিদ্রোহ (১৯৯৬-২০০৬) দেশটিকে রক্তাক্ত করে তোলে। প্রায় ১৩ হাজার মানুষ নিহত হন, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

২০০৬ সালের শান্তিচুক্তি (Comprehensive Peace Accord) ছিল এক মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। এরপরই রাজতন্ত্রকে বিলুপ্ত করে ২০০৮ সালে নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। জনগণ ভেবেছিল, নতুন সংবিধান, নির্বাচিত সরকার ও শক্তিশালী সংসদ—সবকিছু মিলিয়ে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের দুষ্টচক্র

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র এঁকেছে।

২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নেপালে ১২ বারের বেশি সরকার পরিবর্তন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীদের গড় মেয়াদ এক বছরেরও কম।

কোনও সরকার পূর্ণ মেয়াদ টিকতে পারেনি।

মূল কারণ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজন ও ক্ষমতার লড়াই। নেপালের বড় তিনটি দল—নেপালি কংগ্রেস (NC), কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল–ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট (CPN-UML) এবং নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী কেন্দ্র)—পরস্পরের সাথে জোট বাঁধে আবার ভাঙে। এর ফলে নীতিগত ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠে না।

সংবিধান ও প্রাদেশিক কাঠামোর জটিলতা

২০১৫ সালে নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। এতে নেপালকে সাতটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়। কিন্তু সীমান্ত, পরিচয় ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বিশেষ করে মধেসি সম্প্রদায় মনে করে তাদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে আন্দোলন হয়েছে, প্রাণহানিও ঘটেছে।

এখনও পর্যন্ত সংবিধান বাস্তবায়ন পুরোপুরি হয়নি। এর ফলে প্রাদেশিক সরকার ও কেন্দ্রের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়ছে।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংকট

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দুর্নীতি ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার বানিয়ে “নিউ নেপাল মুভমেন্ট” শুরু করে।

আন্দোলনকারীরা দাবি তোলে—দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার।

রাজধানী কাঠমান্ডুসহ প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

সহিংসতায় রূপ নিলে সংসদ ভবনের বাইরে সংঘর্ষ হয়, যানবাহনে আগুন ধরানো হয়।

এই উত্তেজনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। আবারও দেশ প্রবেশ করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার নতুন পর্বে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

রাজনৈতিক অস্থিরতা নেপালের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন।

পর্যটন খাত—যা নেপালের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস—একাধিকবার রাজনৈতিক সংকটে ভুগেছে।

বিদেশে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, কিন্তু দেশীয় কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি।

গণতন্ত্রের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

নেপালের গণতন্ত্র এখন কয়েকটি বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে:

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট – ক্ষমতার দৌড়ে নেতারা রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা – জনসেবা খাতে দুর্নীতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।

অর্থনৈতিক স্থবিরতা – রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত।

জনআস্থা হ্রাস – তরুণ প্রজন্ম হতাশ হয়ে পড়ছে; অনেকেই বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

তবুও আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি জোরালো করছে।

সুশীল সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য সোচ্চার।

আঞ্চলিক কূটনীতি (বিশেষ করে ভারত ও চীনের সাথে সম্পর্ক) নেপালের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে।

 

নেপালের গণতন্ত্র এখনো সংগ্রামের পথে। রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে আসাটা ছিল ঐতিহাসিক সাফল্য, কিন্তু গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্বের অভাবে সেই সাফল্য পূর্ণতা পায়নি। বারবার সরকার পরিবর্তন, দলীয় দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতি নেপালের জনগণকে হতাশ করেছে। তবে তরুণ প্রজন্মের জাগরণ ও সামাজিক আন্দোলন দেখাচ্ছে—গণতন্ত্রের সংগ্রাম এখনো জীবিত।

নেপালের ইতিহাস প্রমাণ করে দিয়েছে—গণতন্ত্র কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, এটি এক দীর্ঘ যাত্রা। আর সেই যাত্রায় নেপালকে এখনও বহু বাধা অতিক্রম করতে হবে।