রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬

সার ডিলারের চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে বিতর্ক: তালিকা বদল ও তদন্ত চেয়ে কৃষিমন্ত্রীকে চিঠি সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও নেতাদের

দিনাজপুর, লালমনিরহাট, বাগেরহাট, শেরপুর ও সিরাজগঞ্জে ডিলার নিয়োগে পক্ষপাত, ঘুষ ও গুদাম না থাকার অভিযোগ উঠেছে; কৃষিমন্ত্রী অনিয়ম প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিলের কথা বলেছেন।

সার ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা দিয়েছে। তালিকা পরিবর্তন, ডিলারশিপ বাতিল ও নতুন করে তদন্ত চেয়ে কৃষিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। অভিযোগের মধ্যে আছে রাজনৈতিক প্রভাব, ঘুষ-দুর্নীতি, যোগ্যতা যাচাইয়ে অনিয়ম এবং সার রাখার উপযোগী গুদাম না থাকা সত্ত্বেও ডিলারশিপ পাওয়া।

দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম গত ২৯ অক্টোবর কৃষিমন্ত্রীকে পাঠানো আধা-সরকারি পত্রে দিনাজপুর সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের তালিকা বদলের সুপারিশ করেছেন। তিনি আগে নির্বাচিত চারটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে নিজের সুপারিশ করা চারটি প্রতিষ্ঠানকে ডিলার করার অনুরোধ জানিয়েছেন। পত্রে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিককে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পদধারী বা সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুল গত ২৬ অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির পাঠানো তালিকা বাদ দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকায় রাখা হয়েছে। তিনি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করেছেন এবং মদাতী, কাকিনা, চলবলা ও দলগ্রাম ইউনিয়নের কয়েকটি নিয়োগে আপত্তি জানিয়েছেন।

বাগেরহাটের চিতলমারীতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীরা গত ২ নভেম্বর কৃষিমন্ত্রীকে পাঠানো আবেদনে ঘুষ-উৎকোচের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, দলের পরীক্ষিত কর্মীদের বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। আবেদনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্তের দাবি করা হয়েছে। বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে এক ব্যবসায়ী খাউলিয়া ইউনিয়নের একটি ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একটি পরিবারের একাধিক সদস্যকে বিভিন্ন সময় ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। শেরপুরের শ্রীবরদীতেও একটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ বাতিল চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বাঙ্গালা ইউনিয়নে নির্বাচিত না হওয়া এক ব্যবসায়ী গত ১ নভেম্বর আবেদন করে জানান, তিনি ২০০০ সাল থেকে কীটনাশক এবং ২০০৭-০৮ সাল থেকে সারের ব্যবসা করছেন, তাঁর প্রায় ৮৫০ বর্গফুটের নিজস্ব পাকা গুদামে ৬০ মেট্রিক টনের বেশি সার রাখার সক্ষমতা আছে। তিনি নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের গুদাম, লাইসেন্স ও অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

শাহজাদপুরের রূপবাটি ইউনিয়নে একটি ডিলারশিপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ বাঘাবাড়ি দক্ষিণপাড় বাজার বাসস্ট্যান্ডে একটি খাবার হোটেলের বেসিনের সামনে সারের গুদামের সাইনবোর্ড টানানো আছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। হোটেলের ম্যানেজার বলেন, আপাতত জায়গাটি হোটেল হিসেবে চলছে, ভবিষ্যতে গুদাম হবে। ডিলার নিজেও স্বীকার করেছেন, লাইসেন্সের আবেদনের সময় হোটেলের ভেতরে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল; সার বরাদ্দ পেলে হোটেলটি গুদামে রূপান্তর করা হবে বলে তাঁর বক্তব্য। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানান, আগে এ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাননি; জানার পর তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

এসব অভিযোগের মধ্যে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, সার বিতরণে অনিয়ম, দুর্নীতি বা কৃষক হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে নতুন ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হবে এবং কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত ২ নভেম্বর রবি মৌসুমের সার সরবরাহ নিয়ে জেলা প্রশাসক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি ডিলারশিপের এলাকা সুনির্দিষ্ট করার নির্দেশও দেন, যেখানে জমির পরিমাণ, কৃষকের সংখ্যা ও ফসলের নিবিড়তা বিবেচনায় নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিন মাসের মধ্যে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ডিলারশিপ চুক্তি বাতিলের সুযোগ আছে।