বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার স্বীকৃতি: ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

গাজার রক্তক্ষয়ী হামলার মধ্যে তিন পশ্চিমা শক্তির স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে

গাজা
ছবি: গাজা

গাজার চলমান গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একদিকে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করছে, অন্যদিকে ইসরায়েল ও তার মিত্রদের কূটনৈতিক সংকটে ফেলছে।

গাজা সিটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলায় শনিবার ভোর থেকে অন্তত ৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গাজা সিটিতেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৭ জন। শিশু ও নারীসহ অসংখ্য হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই তিন পশ্চিমা শক্তি—যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া—একযোগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা রক্ষায় এই পদক্ষেপ জরুরি এবং মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে নেওয়া।”

প্যালেস্টাইনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই স্বীকৃতিকে “সাহসী ও ন্যায়সংগত” সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করে জানায়, “এটি ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আস্থার প্রতিফলন।” একইসঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশকেও এই সিদ্ধান্ত অনুসরণের আহ্বান জানায়।

হামাস এক বিবৃতিতে জানায়, এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের অধিকার ও জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে “গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ”। তবে তারা জোর দিয়ে বলে, এটি শুধু কূটনৈতিক ঘোষণা হয়ে থাকলে চলবে না, বরং গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পদক্ষেপকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে এবং “প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র কখনোই হবে না।” ইসরায়েলি ডানপন্থী মন্ত্রীরা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দখলকৃত পশ্চিম তীরে “সার্বভৌমত্ব” প্রতিষ্ঠার হুমকি দিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের এই স্বীকৃতি একটি ঐতিহাসিক বাঁকবদল। ১৯১৭ সালের বালফোর ঘোষণা থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে লন্ডনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেই যুক্তরাজ্য ৭৫ বছর পর এবার ফিলিস্তিনকেও স্বীকৃতি দিল।

জাতিসংঘে নিযুক্ত পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ সরাসরি মাটির বাস্তবতা পরিবর্তন না করলেও এটি ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধ ও দখলদারিত্বের অভিযোগে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।

অন্যদিকে গাজার মানুষদের পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। হাজারো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যাচ্ছে, অনেকেই রাস্তায় বা অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নিচ্ছে। ওক্সফাম ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গাজায় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা লাখো ছাড়িয়েছে।

সাবেক ব্রিটিশ লেবার নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, “ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি পদক্ষেপ হলেও যুক্তরাজ্যকে এখন গাজায় চলমান গণহত্যাকেও স্বীকৃতি দিতে হবে এবং ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।”

বিশ্বের বহু দেশের দৃষ্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে, যারা বারবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন সম্পর্কিত প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—ওয়াশিংটন কি এবার তার অবস্থান পরিবর্তন করবে, নাকি আগের মতোই ইসরায়েলকে রক্ষা করবে।

গাজার ধ্বংসস্তূপে এখনো অসংখ্য পরিবার তাদের প্রিয়জনদের খুঁজছে। একজন ফিলিস্তিনি বেদনাভরা কণ্ঠে বলেন, “আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, পরিবার হারিয়ে গেছে, কিন্তু আমরা এখনো বেঁচে আছি। আমাদের স্বপ্ন একদিন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দেখতে পাওয়া।”