ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কয়েকজন বিদেশি নেতার মন্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও নির্বোধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। বুধবার কাতারের রাজধানী দোহায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্বাচনের মুখে থাকা কিছু নেতা ফ্রান্সের অস্থিরতাকে নিজেদের রাজনৈতিক লাভে কাজে লাগাচ্ছেন।
মাখোঁ কারও নাম নেননি। তবে বার্তা সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণে, তাঁর নিশানা ছিলেন ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, দুজনই এখন নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। মাখোঁর কথায়, ‘কেউ কেউ ফ্রান্সের ঘাড়ে চড়ে প্রচার চালাচ্ছেন।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট বিদেশ থেকে ‘তথ্য নিয়ে কারসাজি’র অভিযোগও তোলেন। তাঁর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি এমন সব ছবি ছড়ানো হয়েছে, যেসব ঘটনা ফ্রান্সে কখনো ঘটেইনি। অভিবাসী ও ইসলামপন্থীরা ফ্রান্স দখল করে নিয়েছে—এমন দাবিকে তিনি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কী বলেছিলেন
সোমবার কানসাসে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প দাবি করেন, অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের হাতে ফ্রান্স ‘দখল, লুট আর ভস্মীভূত’ হচ্ছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি আরও বলেন, প্যারিস ‘খুব শিগগির মুসলিম শহর’ হয়ে যাবে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ফরাসি উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মারিন লো পেনেরও প্রশংসা করেন, যিনি আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জরিপে এগিয়ে। নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ফ্রান্স ‘উগ্র ইসলামের আগ্রাসনের’ মুখে। তবে বিক্ষোভের পেছনে অভিবাসীরা—এই দাবি একাধিক বিশ্লেষক নাকচ করেছেন।
স্কুল থেকে রাজপথে
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক-সংকট নিয়ে ধর্মঘট থেকে আন্দোলনের সূচনা। দিন দশেকের মধ্যে তা সারা দেশে ছড়ায়। শিক্ষার্থীদের দাবি জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, বাড়তি শিক্ষক, ছোট ক্লাস আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ন্যায্য ব্যবস্থা। তাঁদের অভিযোগ, এসব দুরবস্থা সবচেয়ে বেশি নিম্ন আয়ের শহরতলিতে, যেখানে বর্ণবৈষম্যের অভিজ্ঞতাও প্রবল। অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হন, যাঁদের ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশের বলপ্রয়োগকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত’ বলেছে।
পরে শ্রমিক ইউনিয়নসহ নানা গোষ্ঠী জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে যোগ দেয়। ১৭ অক্টোবর শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নামেন। কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই দাঙ্গায় লুটপাট হয়, লিমোজে নগর ভবনে আগুন দেওয়া হয়; সরকার স্বীকার করে, পরিস্থিতি তাদের ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে গিয়েছিল। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানান, আড়াই হাজার জনকে আটক করা হয়েছে। কয়েকটি শহরে রাতের কারফিউ চলছে, বৃহস্পতিবার প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাখোঁ বলেছেন, ২৪ অক্টোবরের নতুন বিক্ষোভ ঘিরে আইনের মধ্যে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে; জরুরি অবস্থা এখনই দরকার নেই, তবে সে পথ খোলা।
ধারের খরচ ২৪ বছরে সর্বোচ্চ
অস্থিরতার ধাক্কা লেগেছে অর্থবাজারেও। সরকার বন্ড বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা ধার নেয়; বন্ডের ‘ইল্ড’ বা মুনাফার হার কার্যত সেই ধারের সুদ। ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদ চান, তাই ইল্ড বাড়া মানে সরকারের ধার নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হওয়া।
আনাদোলু এজেন্সি জানায়, বুধবার ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে ২৪ বছরের সর্বোচ্চে ওঠে; ফেব্রুয়ারির শেষে তা ছিল প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ। জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে বন্ডবাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ফ্রান্সই। দেশটির সরকারি ঋণ এখন মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১১৯ শতাংশ, আর বাজেট-ঘাটতি কমানোর সংস্কার নিয়ে সংসদে টানাপোড়েন চলছেই। শুক্রবার ফ্রান্সের ঋণমান নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা রয়েছে মুডিস-এর।