বাংলাদেশের ইতিহাসে উদয় হতে যাচ্ছে এক নতুন শক্তি অধ্যায়ের। পাবনার পদ্মা তীরের স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (RNPP) থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া এখন একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে। প্রথমবারের মতো রিঅ্যাক্টর থেকে উৎপন্ন তাপ নিষ্কাশনে সক্রিয় করা হয়েছে কুলিং টাওয়ার, যা প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ও জটিল একটি কারিগরি মাইলফলক।
বর্তমানে প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর থেকে ৫% থার্মাল পাওয়ার (Thermal Power) উৎপন্ন হচ্ছে। উৎপন্ন এই তাপ শক্তির একটি অংশ রিঅ্যাক্টর থেকে স্টিম জেনারেটরের মাধ্যমে বাহিত হয়ে কুলিং টাওয়ারের জলীয় বাষ্প আকারে নিরাপদে রিলিজ হচ্ছে। প্রকল্পের এই সফল প্রাথমিক পরীক্ষা কেন্দ্রটিকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
ধাপে ধাপে বড় জয়ের পথে কারিগরি টিম
প্রকৌশলী ও পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ের এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। রিয়্যাক্টরের ভেতরে পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে সৃষ্ট তাপ শক্তিকে স্টিম জেনারেটরের মাধ্যমে বাষ্পে রূপান্তর করা হয়, যা পরবর্তীতে টার্বাইন ঘোরাতে ব্যবহার করা হয়। আর এই প্রক্রিয়ার উদ্বৃত্ত তাপ কুলিং টাওয়ারের সাহায্যে পরিবেশে নিরাপদে রিলিজ বা ডিসচার্জ করা হয়।
বর্তমানে ৫% সক্ষমতায় রিঅ্যাক্টর, স্টিম জেনারেটর, প্রেসার কন্ট্রোল সিস্টেম এবং কুলিং টাওয়ারের পারফরম্যান্স ও সেফটি প্রোটোকল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক ও মানসম্মত হওয়ায় রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র টিমের প্রতিটি সদস্য অত্যন্ত আশাবাদী।
নভেম্বরেই ৪০% থার্মাল পাওয়ার ও গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ
চলমান সবকটি সেফটি ও টেকনিক্যাল টেস্ট নির্ধারিত ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সুচারুভাবে শেষ হলে, আগামী নভেম্বর মাসেই রিঅ্যাক্টরের থার্মাল পাওয়ার বাড়িয়ে প্রায় ৪০%-এ উন্নীত করা হবে।
থার্মাল পাওয়ার ৪০%-এ পৌঁছানোর সাথে সাথেই শুরু হবে বিশাল সব টার্বাইন ঘুরানোর চূড়ান্ত কাজ। আর টার্বাইন ঘুরলেই উৎপন্ন হবে বহুল প্রতীক্ষিত মেগাওয়াট মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা সরাসরি যুক্ত হবে দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে। ইনশাআল্লাহ, নভেম্বর মাসেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ দেখার জন্য প্রহর গুনছে পুরো জাতি।
৩৩তম পারমাণবিক শক্তির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ
রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি বড় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। প্রথম ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া মাত্রই বাংলাদেশ যুক্ত হবে বিশ্বের অভিজাত পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকারী দেশের কাতারে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ হবে ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী রাষ্ট্র।
স্থানীয় প্রকৌশলী, রাশিয়ান প্রযুক্তিবিদ এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও নিরলস পরিশ্রমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির টেস্ট রান পরিচালিত হচ্ছে। জলবায়ুবান্ধব, সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বেস-লোড বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে রূপপুরের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের আগামী দিনের মেগা-অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার করবে।