চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন পরীক্ষার্থী।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানে ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এরপর নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনলাইনে একযোগে ফল পাওয়া যাচ্ছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে এই গড় হিসাব করা হয়েছে।
পাসের হার কতটা নামল
গত বছরের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশকেই ২০০৪ সালের পর সবচেয়ে কম পাসের হার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০০৪ সালে এই হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এবারের ফল সেই গত বছরের হারকেও ছাড়িয়ে আরও নিচে নেমেছে।
জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ
গত বছর প্রথম প্রকাশিত ফলে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন। সে হিসাবে এবার কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। গত বছর পুনর্নিরীক্ষণ ও উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের পর আরও ৩ হাজার ৭৯ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। আর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন; এবারের সংখ্যা তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষার চিত্র
এবার ১১টি বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন, যাঁদের কিছু অংশ পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছাত্রী ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন ও ছাত্র ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন; ছাত্রীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৬৪৫ জন বেশি।
- নয়টি সাধারণ বোর্ডে পরীক্ষার্থী: ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন
- মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে: ৯২ হাজার ৯০৫ জন
- কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে: ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৯ হাজার ৪৩৯টি, পরীক্ষাকেন্দ্র ২ হাজার ৬৯৭টি
পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২ জুলাই। ৮ আগস্ট লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বন্যায় চট্টগ্রাম বোর্ডের কয়েকটি পরীক্ষা পিছিয়ে যায়; স্থগিত সেই পরীক্ষাগুলো শেষ হয় ৯ সেপ্টেম্বর। ফল প্রকাশের তারিখ প্রথমে ২৯ অক্টোবর ঘোষণা করা হলেও পরে তা পিছিয়ে শনিবার নির্ধারণ করা হয়।
ফল কমার আগাম আভাস ছিল
ফল প্রকাশের আগেই শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমতে পারে বলে আভাস দিয়েছিলেন। তাঁদের ভাষ্যে সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে ছিল পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, সাধারণ বোর্ডগুলোতে অভিন্ন প্রশ্নপত্র, বাড়তি নম্বর না দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়া নজরদারি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ও নিয়মিত পড়াশোনায় অনীহার প্রভাবের কথাও তাঁরা বলেছিলেন। এগুলো ফল প্রকাশের আগের মূল্যায়ন; ফল কমার বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
আলিমেও অবনতি
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৪৭ জন; তাঁদের মধ্যে ছাত্র ২৯ হাজার ২৬৯ ও ছাত্রী ২৫ হাজার ২৭৮ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৪ দশমিক ৯০ শতাংশ আর ছাত্রদের ৫৮ দশমিক ১০ শতাংশ; দুটিই গত বছরের সম্মিলিত ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশের অনেক নিচে। আলিমে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ২৫০ জন, যা গত বছর ছিল ৪ হাজার ২৬৮ জন। এই জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্র ২ হাজার ২৮ ও ছাত্রী ১ হাজার ২২২ জন।
রাজশাহী বোর্ডের দিকে নজর
রাজশাহীসহ বিভিন্ন বোর্ডের এবারের আলাদা পাসের হার, ছাত্র-ছাত্রীভিত্তিক হিসাব এবং শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তুলনার জন্য, গত বছর রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা আগের বছরের ৮১ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে নেমে এসেছিল। সে বছর বোর্ডটিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১০ হাজার ১৩৭ জন এবং ৩৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেননি। ছাত্রীদের পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ, ছাত্রদের ৫০ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
সারা দেশে গত বছর ২০২টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেননি এবং শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৪৫টি।
যেভাবে ফল জানা যাবে
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে: প্রতিষ্ঠানগুলো বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে ইআইআইএন নম্বর দিয়ে ফল ডাউনলোড করে প্রকাশ করবে।
- ওয়েবসাইটে: eduboardresults.gov.bd ও educationboardresults.gov.bd অথবা নিজ নিজ বোর্ডের ওয়েবসাইটে।
- এসএমএসে: এবার নম্বর বদলেছে; আগের ১৬২২২ নয়, পাঠাতে হবে ১৬১৪০ নম্বরে। HSC লিখে স্পেস দিয়ে বোর্ডের প্রথম তিন অক্ষর, স্পেস দিয়ে রোল নম্বর, স্পেস দিয়ে ২০২৬ লিখতে হবে। যেমন ঢাকা বোর্ডের জন্য: HSC Dha 123456 2026।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড বা পত্রিকা অফিস থেকে কোনো ফল দেওয়া হবে না।
পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন
ফলে অসন্তুষ্ট পরীক্ষার্থীরা ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করতে হবে শুধু অনলাইনে, হাতে হাতে কোনো আবেদন নেওয়া হবে না। প্রতি পত্রের ফি ১৫০ টাকা। দুই পত্রের বিষয়ে উভয় পত্রের জন্যই আবেদন করতে হবে। ফি মোবাইল আর্থিক সেবা বা নির্ধারিত ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে দেওয়া যাবে। ফি দেওয়ার পর আবেদন বাতিল করা যাবে না এবং ফি ফেরত দেওয়া হবে না।
ফল প্রকাশের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাসের হার ৫৩ দশমিক ২৩ শতাংশ বলে একটি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছিল। ফলের তথ্যের জন্য বোর্ডের ওয়েবসাইট বা আনুষ্ঠানিক সূত্রের ওপরই নির্ভর করার পরামর্শ দেওয়া যায়।