বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

সাগর-রুনি হত্যা: টাস্কফোর্সের অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে, অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ, তদন্তে আরও ছয় মাস

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে; খুনিদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য এখনো নির্দিষ্ট করা যায়নি।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ তদন্তের পরও হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো সুনির্দিষ্ট করা যায়নি।

বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়। তদন্তের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ সময়ের আবেদন করলে আদালত ছয় মাস সময় দিয়েছেন। পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ২৯ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছে।

সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর্যবেক্ষণ

সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে টাস্কফোর্স বলেছে, সাগর ও রুনির কারও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে উল্লেখযোগ্য আঘাত ছিল না এবং হত্যাকাণ্ড পেশাদার খুনির অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দুজনের দেহেই অনেকগুলো ক্ষত ছিল, যা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণ। প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে তাঁরা অনেকক্ষণ ক্ষতসহ জীবিত ছিলেন। ঘাড়ে, পিঠে ও চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থল ও ক্ষতের পরিমাণ দেখে টাস্কফোর্সের মত, খুনিরা তাড়াহুড়া করেনি।

অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগরকে বাঁধার কাজে ব্যবহৃত চাদর এবং রুনির টি-শার্ট থেকে নেওয়া নমুনায় দুজন অপরিচিত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এই ডিএনএ পরীক্ষার কাজ বিদেশের একাধিক ল্যাবে করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল্যাবে অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টাও হয়েছে। তবে ডিএনএর অতিরিক্ত মিশ্রণের কারণে অপরাধীদের চেহারার ছবি প্রস্তুত করা যায়নি। জব্দ করা ছুরি, বঁটি, নিহতদের পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত এবং ২৫ জন ব্যক্তির নমুনা পাঠানো হলেও কারও ডিএনএর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে ঘটনাস্থলে চারজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে; এর মধ্যে সাগর ও রুনিকে শনাক্ত করা গেছে, বাকি দুজন অজ্ঞাতনামা পুরুষ।

পারিবারিক বা পেশাগত বিরোধের প্রমাণ মেলেনি

টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন বলছে, পারিবারিক কলহের জেরে একজনকে হত্যার পর অন্যজনের আত্মহত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পেশাগত শত্রুতা বা অর্থ ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের তথ্যও মেলেনি। দম্পতি দীর্ঘদিন জার্মানিতে ছিলেন এবং মৃত্যুর সাত মাস আগে দেশে ফেরেন। সাগরের তৎকালীন কর্মস্থলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেও পেশাগত বিরোধের খোঁজ মেলেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্টের কাজ তাঁদের মৃত্যুর পর শুরু হওয়ায় ওই গ্রুপের সঙ্গে হত্যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলেও বলা হয়েছে।

আইসিটি প্রসিকিউটরদের বক্তব্য

প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে বলা হয়েছে, গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রকাশ্যে জানান, দুদক এনটিএমসির সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালিয়ে কিছু ডিজিটাল আলামত জব্দ করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও একই কথা বলেন। টাস্কফোর্সের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় তাঁরা জানান, জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা তাঁরা যাচাই করছেন এবং প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে তথ্য পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করবেন। টাস্কফোর্স গত ১৩ অক্টোবর চিঠি দিয়ে ওই ডিজিটাল আলামত ও তথ্য চেয়েছে, তবে প্রতিবেদন দাখিলের সময় পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত এই মামলায় কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

জিজ্ঞাসাবাদ ও উদ্ধার বাকি

টাস্কফোর্স জানিয়েছে, পিবিআই, সিআইডি, পুলিশ সদর দপ্তর ও র‍্যাবের সমন্বয়ে গঠিত দলটি লুণ্ঠিত মুঠোফোন ও দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি। তদন্তসংশ্লিষ্ট সাবেক আইজিপি, ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক রুমী নোমানের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। মূল রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং আইসিটির তথ্য যাচাইয়ের জন্য তদন্তে আরও সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি খুন হন।