রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। উপজেলার অধিকাংশ কলেজেই পাসের হার অত্যন্ত হতাশাজনক। বিশেষ করে মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশিত ‘এইচএসসি-২০২৬ পরীক্ষার ফলাফল সারসংক্ষেপ (গোদাগাড়ী উপজেলা)’ সূত্রে এই চিত্র উঠে এসেছে।
সবচেয়ে খারাপ ফলাফল: মাটিকাটা আদর্শ কলেজ
উপজেলার ১৪টি কলেজের মধ্যে ফলাফলের দিক থেকে একদম তলানিতে রয়েছে মাটিকাটা আদর্শ কলেজ (EIIN: 126760)। এই প্রতিষ্ঠানে মোট ১০৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও পাস করেছে মাত্র ৮ জন। ফলে কলেজটিতে পাসের হার নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭.৭৭%-এ। যেখানে বিজ্ঞানে ৫ জন পাস করলেও মানবিকে ৩ জন এবং বাণিজ্য বিভাগে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
অন্যান্য কলেজগুলোর করুন চিত্র
তালিকায় থাকা প্রায় প্রতিটি কলেজেই পাসের হার ৩০ শতাংশের নিচে বা তার কাছাকাছি। ফলাফলের ক্রম অনুযায়ী অন্য কলেজগুলোর অবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো:
রাজবাড়ী কলেজ: মোট ১৪৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৮ জন, পাসের হার ১২.৬৮%।
প্রেমতলী ডিগ্রি কলেজ: ১৩৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২৮ জন, পাসের হার ২০.৯০%।
গোদাগাড়ী সরকারি কলেজ: ২০৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৪২ জন, পাসের হার ২১.১১%।
পালপুর ধর্মপুর কলেজ: ৭৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৫ জন, পাসের হার ২১.১৩%।
পাকড়ি কলেজ: ৯০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২১ জন, পাসের হার ২৪.১৪%।
লালিতনগর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ: ৭৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৯ জন, পাসের হার ২৪.৬৮%।
বিশ্বনাথপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ: ২৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫ জন, পাসের হার ২৫.০০%।
কাকনহাট কলেজ: ১৭৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৪৫ জন, পাসের হার ২৬.৭৯%।
চব্বিশনগর স্কুল অ্যান্ড কলেজ: ৯৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২৫ জন, পাসের হার ২৭.১৭%।
গুলগোফর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ: ৬১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৬ জন, পাসের হার ২৭.৫৯%।
কিছুটা এগিয়ে যারা
উপজেলার তুলনামূলক ভালো ফলাফল করা শীর্ষ ৩টি প্রতিষ্ঠানের চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও সন্তোষজনক নয়:
গোদাগাড়ী সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ: ২৭৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮০ জন এবং পাসের হার ৩০.৪২%। পুরো উপজেলায় একমাত্র এই কলেজ থেকেই ১ জন শিক্ষার্থী GPA 5 অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
গোদাগাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ: ১৭২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৮ জন পাস করায় পাসের হার ৪৭.২৭%।
গোগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ: ৪১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১ জন পাস করায় পাসের হার ৫২.৫০%, যা এই তালিকার মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে এই কলেজেও কোনো GPA 5 নেই।
মানবিক বিভাগে গণ-ফেল
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশেষ করে মানবিক বিভাগে বিপর্যয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। উদাহরণস্বরূপ, গোদাগাড়ী সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিকেই ১৬৬ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। একইভাবে কাকনহাট কলেজে মানবিকে ১০৪ জন এবং রাজবাড়ী কলেজে ১১৯ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত ক্লাস মনিটরিং এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা আরও বেশি সংকটের মুখে পড়বে। দ্রুত এই বিপর্যয়ের কারণ উদঘাটন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবকবৃন্দ।