একসময় পদ্মা ও যমুনার সংযোগ রক্ষাকারী খরস্রোতা বড়াল নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। শরৎকালেও নদীটির বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ নেই। কোথাও নদী শুকিয়ে চাষাবাদ হচ্ছে, কোথাও দখল করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও গুদাম গড়ে তোলা হয়েছে, আবার কোথাও আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ চলছে। এর প্রভাব পড়ছে চলনবিলের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে।
রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদী থেকে বড়ালের উৎপত্তি। রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার ওপর দিয়ে প্রায় ২০৪ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জে নদীটি যমুনায় মিশেছে। বড়ালকে চলনবিলের প্রধান নদী ও প্রাণ বলা হয়। পদ্মা ও যমুনার পানি বড়াল হয়ে চলনবিলে ঢোকায় একসময় সারা বছরই বিলের বিভিন্ন অংশে পানির প্রবাহ সচল থাকত।
নদীটি আপার ও লোয়ার বড়াল—এই দুই অংশে বিভক্ত। চারঘাট থেকে নাটোরের গুরুদাসপুর পর্যন্ত প্রায় ৮৪ কিলোমিটার আপার বড়াল। আর নাটোরের আটঘড়ি থেকে বনপাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও সাঁথিয়া হয়ে বেড়ার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার লোয়ার বড়াল।
স্লুইস গেট ও দখল
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ একাধিক স্লুইস গেট। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৮৫ সালে বড়াল বেসিন ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় চারঘাটে নদীর উৎসমুখে তিন দরজাবিশিষ্ট একটি স্লুইস গেট নির্মাণ করে। এতে পদ্মা থেকে বড়ালে স্বাভাবিকভাবে পানি ঢোকা বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে নাটোরের আটঘড়িতে পাঁচ দরজাবিশিষ্ট আরেকটি স্লুইস গেট তৈরি হয়। নদীর আরও কয়েকটি স্থানেও এ ধরনের স্থাপনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব অবকাঠামোর কারণে পানিপ্রবাহ কমেছে; বিশেষ করে আটঘড়ি থেকে বনপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় নদীর অস্তিত্ব সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
জীবন-জীবিকায় প্রভাব
আশির দশক পর্যন্ত বড়াল দিয়ে বড় পণ্যবাহী নৌকা, বার্জ, কার্গো জাহাজ, লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল করত। নদীপথে ধান, চাল, পাট, মসুর, খেসারি ও সরিষাসহ নানা কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেত। নদীর পানি ব্যবহার করে তীরবর্তী জমিতে সেচ দেওয়া হতো।
এখন পানি কমে যাওয়ায় সেচের জন্য কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, ফলে পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলনবিলের পানিসংকট ও মাছের প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় মৎস্যসম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় চলনবিলে ৭০ থেকে ৭৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত; এখন অনেক প্রজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে। হাঁস পালন ও গবাদিপশুর খাদ্যের জোগানও কমেছে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি চলনবিলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নদীনির্ভর মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে বড়ালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরানো জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁরা নদীর দখল উচ্ছেদ, অবৈধ বাঁধ অপসারণ, নাব্যতা পুনরুদ্ধার এবং স্লুইস গেটগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।