বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

কোয়ান্টাম সার্কিট গবেষণায় পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল ২০২৫

সুপারকন্ডাক্টর সার্কিটে কোয়ান্টাম টানেলিং ও শক্তির ক্বান্টাইজেশন প্রদর্শনের জন্য স্বীকৃতি — তাদের গবেষণা আধুনিক কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেছে

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী
ছবি: পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী

রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ২০২৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করেছে জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. ডেভোরে ও জন এম. মার্টিনিসকে। তারা প্রমাণ করেছেন, কোয়ান্টাম যান্ত্রিক প্রভাব কেবল পরমাণু বা ক্ষুদ্র কণার মধ্যেই নয়, বরং হাতে ধরা যায় এমন বৃহদাকার বৈদ্যুতিক সার্কিটেও কার্যকর হতে পারে।

২০২৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করেছে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস। এ বছর পুরস্কার পাচ্ছেন জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. ডেভোরে ও জন এম. মার্টিনিস, তাদের বৃহদাকার বৈদ্যুতিক সার্কিটে কোয়ান্টাম টানেলিং ও শক্তির ক্বান্টাইজেশন (quantisation) আবিষ্কারের জন্য।

তাদের যুগান্তকারী গবেষণা ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পরিচালিত হয়েছিল। এ গবেষণা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষুদ্র জগত ও দৃশ্যমান বৃহৎ জগতের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সংযোগ স্থাপন করে, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

গবেষণায় তারা ব্যবহার করেন একটি বিশেষ ধরনের সুপারকন্ডাক্টর সার্কিট, যেখানে দুইটি সুপারকন্ডাক্টরকে এক পাতলা অ-পরিবাহী স্তর দ্বারা পৃথক করা হয় — এই বিন্যাসকে বলা হয় জোসেফসন জাংশন (Josephson junction)। এই সার্কিটে তারা দেখান, বৈদ্যুতিক প্রবাহ একসময় এমনভাবে আচরণ করে যেন পুরো সার্কিটটি একটি একক কণার মতো।

প্রথমে সার্কিটে বিদ্যুৎ প্রবাহ থাকলেও কোনো ভোল্টেজ থাকে না — এটি একপ্রকার স্থিতিশীল অবস্থায় আটকে থাকে। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায়, সার্কিটটি কোয়ান্টাম টানেলিং-এর মাধ্যমে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে, অর্থাৎ এটি একপ্রকার "বাধা ভেদ করে" অন্য অবস্থায় প্রবেশ করে এবং তখনই ভোল্টেজ দেখা যায়।

আরও বিস্ময়কর ছিল তাদের শক্তির ক্বান্টাইজেশন (energy quantisation) পর্যবেক্ষণ। তারা দেখান, সার্কিটটি শক্তি শোষণ বা নির্গমন করে নির্দিষ্ট পরিমাণে — কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী পূর্বাভাসিত সেই একইভাবে। এটি ছিল প্রথম দিকের প্রমাণগুলোর একটি, যা দেখায় যে একটি দৃশ্যমান বস্তুতেও কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকতে পারে।

> “তাদের কাজ দেখিয়েছে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স শুধু পরমাণু ও উপ-পরমাণু জগতেই সীমাবদ্ধ নয়,” মন্তব্য করেছে নোবেল কমিটি। “এটি এমন সিস্টেমেও প্রযোজ্য, যা মানুষের চোখে দৃশ্যমান।”

 

এই আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য বিপ্লবী এক দিকনির্দেশনা তৈরি করেছে। তাদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আজকের কোয়ান্টাম প্রযুক্তি — যার মধ্যে রয়েছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি, এবং অতিসংবেদনশীল কোয়ান্টাম সেন্সর।

যেমন ট্রানজিস্টর আধুনিক কম্পিউটারের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তেমনি ক্লার্ক, ডেভোরে ও মার্টিনিসের এই আবিষ্কার খুলে দিয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের কোয়ান্টাম ডিভাইসের যুগ, যেখানে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হয় কোয়ান্টাম নীতির মাধ্যমেই।

২০২৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার তাই শুধু এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের স্বীকৃতি নয়, বরং চলমান প্রযুক্তিগত বিপ্লবেরও প্রতীক — যে বিপ্লব ভবিষ্যতের কম্পিউটিং, যোগাযোগ ও পরিমাপ প্রযুক্তিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।