বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬

থেমে যেতে পারে অ্যাটলান্টিকের স্রোত: মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী শতাব্দীর মধ্যেই পৃথিবী প্রবেশ করতে পারে জলবায়ু বিপর্যয়ের অচেনা এক যুগে

সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ স্রোতব্যবস্থা Amoc ভেঙে পড়ার ঝুঁকি এখন আর দূরবর্তী সম্ভাবনা নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই এ স্রোত ভেঙে পড়তে পারে, যা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু, কৃষি, অর্থনীতি ও মানবজীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।

Amoc কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

Amoc বা Atlantic Meridional Overturning Circulation পৃথিবীর জলবায়ুর জন্য এক প্রকার “জীবনরেখা।” এটি দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে উষ্ণ পানি উত্তরে নিয়ে যায়, যা ইউরোপকে তুলনামূলক উষ্ণ রাখে এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থায় ভারসাম্য বজায় রাখে। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া পানি আবার গভীর সমুদ্রস্রোতের মাধ্যমে দক্ষিণে ফিরে আসে।

যদি এই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে, তবে পৃথিবীর জলবায়ু এক ধাক্কায় বদলে যাবে।

 

অতীতে যা ঘটেছিল?

বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, প্রায় ১২,৮০০ বছর আগে শেষ বরফ যুগে Amoc হঠাৎ থেমে গিয়েছিল।

এতে উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রা কয়েক বছরের মধ্যেই ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা দীর্ঘকালীন হিমযুগে প্রবেশ করেছিল।

বৃষ্টিপাতের ধারা বদলে গিয়ে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছিল।

আজকের পরিস্থিতি সেই ইতিহাসকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

 

সাম্প্রতিক গবেষণা কী বলছে?

উচ্চ কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ৭০% ক্ষেত্রে Amoc পতন ঘটবে।

মাঝারি নিঃসরণে ৩৭% ক্ষেত্রে ঝুঁকি।

এমনকি নিঃসরণ কমিয়ে রাখলেও ২৫% সম্ভাবনা থেকে যাবে।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, আগামী ১০–২০ বছরের মধ্যেই Amoc এর টিপিং পয়েন্টে পৌঁছে যেতে পারে। একবার টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করলে পতন রোধ করা আর সম্ভব হবে না।

 

সম্ভাব্য পরিণতি

Amoc ভেঙে পড়লে—

ইউরোপে ভয়াবহ পরিবর্তন

শীতকালে হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা ও তুষারঝড়

গ্রীষ্মে খরা ও পানির অভাব

উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে বিপর্যয়

বৃষ্টিপাতের ধারা সরে গিয়ে কৃষি উৎপাদনে বড় ধস

আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকট

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়তি ৫০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি

বাংলাদেশ, মালদ্বীপসহ অনেক নিম্নভূমি রাষ্ট্র ঝুঁকির মুখে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আঘাত

কৃষি, মৎস্য ও বাণিজ্য ব্যাহত

কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে জলবায়ু শরণার্থী হবে

 

বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা

অধ্যাপক স্টেফান রাহমস্টর্ফ বলেন,

“Amoc পতনের সম্ভাবনা একসময় খুবই কম ধরা হতো, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ঝুঁকি ২৫% বা তারও বেশি। এটি মানবসভ্যতার জন্য এক অ্যালার্ম।”

ড. সাইব্রেন ড্রাইফহাউট মনে করেন, উত্তর আটলান্টিকের তথ্য ইতিমধ্যেই পতনের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষকরা একমত যে আর্কটিক বরফ গলন, মিঠা পানির প্রবাহ ও সমুদ্রের ঘনত্ব পরিবর্তন পতনের গতি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

 

বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রভাব

Amoc পতন কেবল জলবায়ুর নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও বড় সংকট ডেকে আনবে।

আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য ঘাটতি ও খরা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে।

জলবায়ু শরণার্থীর ঢল উন্নত দেশগুলোর সীমানায় চাপ সৃষ্টি করবে।

অর্থনৈতিক মন্দা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অচল করে দিতে পারে।

 

এখন কী করা দরকার?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই—

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার নাটকীয়ভাবে কমাতে হবে

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত রূপান্তর

বন সংরক্ষণ ও আর্কটিক অঞ্চলে জরুরি সুরক্ষা

কারণ একবার Amoc পতন শুরু হলে তা আর ফেরানো সম্ভব হবে না।

 

অ্যাটলান্টিক স্রোতের পতনের সম্ভাবনা মানবসভ্যতার সামনে এক অদৃশ্য বিপদের ঘণ্টাধ্বনি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন— যদি আমরা এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন এক পৃথিবী উত্তরাধিকার হিসেবে দিতে হবে, যেখানে জলবায়ু, খাদ্য ও বসবাসের নিরাপত্তা আর নিশ্চিত থাকবে না।